বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবহণ করা হয়। ইরান এখন এটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত করতে চাইছে। এর ফলে বিশ্বের তেল এবং গ্যাস সরবরাহের পথটি কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
ইরান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কর্তৃক পরিচালিত আগ্রাসনের অবসান ঘটানোর জন্য তার দাবির একটি তালিকা দিয়েছে। এই তালিকার মধ্যে একটি নতুন দাবি রয়েছে, যা আগে তেহরানের শর্তে ছিল না, এবং তা হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের লক্ষ্য
ইরান হরমুজ প্রণালিকে বছরে কয়েক শত কোটি ডলার আয়ের উৎসে পরিণত করতে চাচ্ছে এবং একই সাথে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। ইরানের হামলার কারণে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বাইরের দেশগুলোও তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
এছাড়া, ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দিয়ে আসছিল যে, যদি হামলা হয়, তবে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে। কিন্তু কেউ ভাবতে পারেনি যে তারা এই হুমকিকে এতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে, এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরানের প্রভাব
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান দিনা এসফানদিয়ারি বলেন, “হরমুজ নিয়ে নিজেদের কৌশল যে এতটা সফল হবে, তা ইরানও কল্পনা করেনি। তুলনামূলক কম খরচে ও সহজ উপায়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখা সম্ভব হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “এ যুদ্ধ থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো, ইরান নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের এই সক্ষমতা বুঝতে পেরেছে এবং ভবিষ্যতে সেটি আবার ব্যবহার করার সম্ভাবনা আছে।”
ওয়াশিংটন এই ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত শুক্রবার সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধের পর হরমুজে ইরানের একটি টোল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের টোল আদায়ের পরিকল্পনা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হরমুজ প্রণালির ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো যে প্রভাব ও সক্ষমতা ইরানের আছে, তা ব্যবহার করে যেতে হবে।”
এদিকে, ইরান তাদের এই প্রভাবকে আয় করার উৎসে পরিণত করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের আইনপ্রণেতারা এমন একটি বিল অনুমোদনের কথা বিবেচনা করছেন, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করা হবে।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং হরমুজের গুরুত্ব
মার্কিন নেভাল ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনবিষয়ক অধ্যাপক জেমস ক্রাস্কা বলেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য টোল ধার্য করাটা আন্তর্জাতিক নিয়মের লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রণালিতে টোল নেওয়ার অধিকার নেই।” তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ, এবং এটি এমন একটি জলপথ যা সব দেশের জন্য উন্মুক্ত।”
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুমোদন করেনি, তবুও ক্রাস্কা মনে করেন যে, এই সনদটির অনেক মূলনীতি প্রযোজ্য হতে পারে।
হরমুজে টোল আদায়ের সম্ভাবনা
সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায় শুরু করে, তবে এটি মিসরের সুয়েজ খালের আয় থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হতে পারে। প্রতি দিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহণ করা হয়। প্রতিটি ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার ফি আদায় করলে দৈনিক আয় প্রায় ২ কোটি ডলার, যা মাসে প্রায় ৬০ কোটি ডলার হবে।
এছাড়া, এলএনজি পরিবহণ যোগ করলে আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে, যা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানির আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের সমান হতে পারে।
ভবিষ্যতে ইরানের সম্ভাবনা
ইরান হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আয়ের নতুন সুযোগ দেখতে পাচ্ছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের দিনা এসফানদিয়ারি বলছেন, এটি নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক ঘাটতি পূরণের উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর ইরানের এই প্রভাব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা তাদের জন্য অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

