ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিস্থিতি খুবই জটিল এবং এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পুরো পৃথিবী জুড়ে পড়বে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই যুদ্ধকে আরও তীব্র করে, তাহলে গ্লোবাল অর্থনীতি, তেল ও গ্যাসের দাম, এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে প্রভাবিত হবে। তবে, এই পরিস্থিতির পরিণতি কী হতে পারে? চলুন একে একে বিশ্লেষণ করি।
যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধে হাল ছেড়ে দেন এবং ফিরে আসেন, তবুও ইরান এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে যে হুমকি রয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালীতে শিপিংয়ের জন্য যে বিপদ, তা অব্যাহত থাকবে। এর ফলস্বরূপ, তেলের দাম থাকবে অত্যন্ত উচ্চ, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা আরও কমে যাবে, বিশেষত এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।
অন্যদিকে, যদি ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চান এবং এখনকার পরিস্থিতি অব্যাহত রাখতে চান, তবে একই সমস্যা থাকবেই। ইরানের সরকার এখনও ক্ষমতায় থাকবে, এবং তারা তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। এর ফলে সারা বিশ্বে অস্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
ট্রাম্প এবং ইসরায়েল দুটি বড় ভুল করেছেন। তারা ভাবছিলেন, ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলে সরকারের পতন হবে এবং ইরান দ্রুত যুদ্ধ শেষ করবে। তবে বাস্তবে তাদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইরান খুব শক্তিশালীভাবে প্রতিরোধ করেছে এবং তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে এবং তেলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই কারণে, এখন মার্কেট ট্রাম্পের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, এবং অনেকেই বিশ্বাস করছেন যে তিনি হয়তো যুদ্ধ থেকে পালানোর চেষ্টা করবেন—এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যা তাদের কাছে “TACO” (Trump Always Chickens Out) নামে পরিচিত।
তবে, ট্রাম্প যদি যুদ্ধ শেষ করে দেন এবং ইরান সরকারকে তাদের অবস্থানে থাকতে দেন, তবে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি আবারও বিপদে পড়বে। সুতরাং, ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত হল যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানো এবং যুদ্ধের পরিণতি শীঘ্রই নির্ধারণ করা।
বর্তমানে, ট্রাম্প এবং ইসরায়েল একটি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন: ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল। এই দ্বীপের মাধ্যমে ইরান তাদের ৯০% তেল উৎপাদন রপ্তানি করে। যদি তারা এই দ্বীপ দখল করতে পারে এবং ইরানের শক্তিকে দুর্বল করতে পারে, তাহলে হয়তো ইরানের সরকারের পতন হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এটি একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, তবে এর ফলস্বরূপ যদি সফল হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। গাল্ফের তেল উৎপাদন এবং বিশ্বের বাজার নিরাপদ হতে পারে।
তবে, যদি খার্গ দ্বীপ দখলের পরেও ইরান সরকার টিকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। হরমুজ প্রণালী এবং বায়বীয় ম্যান্ডেব প্রণালী (যা বর্তমানে হুথি নিয়ন্ত্রিত) আবারও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতিতে, মধ্যপ্রাচ্য এবং তেলের উৎপাদন ব্যবস্থার উপর আবারও ঝুঁকি তৈরি হবে।
এছাড়া, ১৯৭০-এর দশকের মতো আবারও অর্থনৈতিক স্থবিরতা বা স্ট্যাগফ্লেশন দেখা দিতে পারে, যেখানে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির থাকবে।
ইরান ইসলামী শাসনব্যবস্থা গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের জনগণের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তাদের কার্যকলাপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ প্রচার করেছে এবং ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন সৃষ্টি করেছে। এই শাসনব্যবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে, তা পুরো বিশ্বকে বিপদে ফেলবে।
এছাড়া, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কারণে সারা পৃথিবী ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
যুদ্ধের শেষ হতে পারে দুইভাবে—একটি ভাল এবং একটি খারাপভাবে। ভালভাবে শেষ হলে, ইরান সরকার পতিত হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু খারাপভাবে শেষ হলে, অর্থনৈতিক সংকট এবং অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে।
এখন, মূল প্রশ্ন হল, ট্রাম্প এবং ইসরায়েল কী সিদ্ধান্ত নেবেন? তারা যদি এই যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারণে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেন, তবে সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

