হাইতির প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত আর্টিবোনাইট অঞ্চলের পেতিত-রিভিয়ের এলাকায় ভয়াবহ এক হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রবিবার (২৯ মার্চ) ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই নৃশংস তাণ্ডব চলে সোমবার (৩০ মার্চ) পর্যন্ত। স্থানীয় একটি মানবাধিকার সংস্থা নিহতের এই সংখ্যার তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পুরো ঘটনায় একদিকে যেমন শোক নেমে এসেছে, অন্যদিকে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘গ্রান গ্রিফ’ নামের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলার পেছনে রয়েছে। তারা জ্যাঁ-দেনির আশপাশের গ্রামগুলোতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায়। শুধু তাই নয়, হামলাকারীরা প্রায় ৫০টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে মুহূর্তেই এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, কান্না আর ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য। অনেক পরিবার রাতের অন্ধকারেই প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
মানবাধিকার সংস্থা ডিফেন্সার্স প্লাস জানিয়েছে, এই সহিংসতার কারণে প্রায় ৬,০০০ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ বলছে, গত কয়েক দিনে প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়েছেন ২,০০০-এর বেশি মানুষ। এই দুই পরিসংখ্যানের পার্থক্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা অস্থির এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই হামলা পেতিত-রিভিয়েরের মানুষের জীবনকে ভয়াবহভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া তথ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা ৭০ এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, নিহতের সংখ্যা ১৬। পরে বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগ জানায়, অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আর জাতিসংঘ বলছে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা ১০ থেকে ৮০ জনের মধ্যে হতে পারে। সংস্থাটি এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংখ্যার এই অসামঞ্জস্য কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, বরং ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকেও সামনে নিয়ে আসে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় হামলার দায় স্বীকার করেছেন গ্রান গ্রিফের নেতা লাকসন এলান। তিনি দাবি করেন, অন্য একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী আগে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। আর সেই হামলার প্রতিশোধ নিতেই তারা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তবে প্রতিশোধের এই যুক্তি কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর চালানো এমন বর্বরতার ব্যাখ্যা হতে পারে না। কারণ হামলার শিকার হয়েছে সাধারণ গ্রামবাসী, তাদের ঘরবাড়ি, তাদের নিরাপত্তা এবং তাদের ভবিষ্যৎ।
উল্লেখ্য, এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও মাদক পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে হাইতিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না। ফলে গ্রাম ও শহর—উভয় স্থানেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে।
হাইতির জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থলে তিনটি সাঁজোয়া যান পাঠিয়েছিল। কিন্তু দুষ্কৃতকারীদের তৈরি করা গর্তের কারণে পুলিশের গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। এরই মধ্যে হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য আগেভাগেই পথ নষ্ট করে রাখা হয়েছিল। এতে স্থানীয়দের ক্ষোভ আরও বেড়েছে, কারণ অনেকের প্রশ্ন—যদি পুলিশ সময়মতো পৌঁছাতে পারত, তাহলে হয়তো এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
বর্তমানে অপরাধীদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তবে তাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার পর পুরো এলাকা জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেসব পরিবার পালিয়ে গেছে, তাদের অনেকেই জানে না তারা কবে আবার নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে। যাদের বাড়ি পুড়ে গেছে, তাদের সামনে এখন বেঁচে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আর্টিবোনাইট অঞ্চলকে হাইতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৃষি এলাকা হিসেবে দেখা হয়। দেশটির খাদ্য উৎপাদনে এ অঞ্চলের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই এই সহিংসতা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং দেশটির খাদ্য সংকটের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষিজমি, শ্রমশক্তি, স্থানীয় বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এমন হামলার নেতিবাচক প্রভাব দ্রুতই সামনে আসতে পারে। এমনিতেই সংকটে থাকা একটি দেশে কৃষি অঞ্চলে এই ধরনের সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে দেশটিতে প্রায় ২০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং দেশের প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, হাইতির নিরাপত্তা সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর এক জাতীয় বিপর্যয়ের অংশ। একের পর এক হামলা, গোষ্ঠীগত সহিংসতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং মানবিক সংকট দেশটিকে ক্রমেই আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কিন্তু বাস্তবে হাইতির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং সাম্প্রতিক এই হামলা আবারও প্রমাণ করল, কাগুজে আশ্বাস আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এখনও নিরাপদ নন, গ্রামগুলো এখনও ঝুঁকির মধ্যে, আর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনও ভয় দেখিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।
সব মিলিয়ে, পেতিত-রিভিয়েরের এই হামলা শুধু একটি সহিংস ঘটনার খবর নয়—এটি হাইতির চলমান রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, মানবিক সংকট এবং নিরাপত্তা বিপর্যয়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। নিহত মানুষের সংখ্যা যতই হোক, প্রতিটি প্রাণহানি একেকটি পরিবারকে শোকের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো হাজারো মানুষ এখন বেঁচে থাকা, আশ্রয় পাওয়া এবং নিরাপত্তা ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। আর বিশ্ব দেখছে—একটি দেশের মানুষ কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে ভয়, সহিংসতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

