ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে কূটনৈতিক ভাষা শোনা গেলেও ময়দানের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চান। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এমন সব বক্তব্য দিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। সাংবাদিকদের সামনে তিনি ইরানের আরও যেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হতে পারে, তার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এমনকি খার্গ দ্বীপ ও ইরানের বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোকেও নতুন করে হুমকির তালিকায় আনা হয়েছে।
এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে এক মাস পার করেছে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, সংঘাতের পরিধি ততই বিস্তৃত হচ্ছে। শুরুতে যা সীমিত প্রতিশোধমূলক হামলা বলে মনে হয়েছিল, তা এখন রূপ নিচ্ছে বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে। পরমাণু স্থাপনা, তেল অবকাঠামো, বন্দর, সামরিক ঘাঁটি, এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্র—সবই এখন হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিটি নতুন হামলার পর পাল্টা আঘাত আরও কঠোর হচ্ছে। ফলে যুদ্ধের ভাষা এখন আর কেবল সামরিক নয়; এটি অর্থনীতি, জ্বালানি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধের এক মাস: আগের চেয়ে বেশি ভয়াবহ বাস্তবতা
এক মাস ধরে চলা এই সংঘাতে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো সরাসরি টার্গেটে পরিণত হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইসরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও স্টিল কারখানায় বড় ধরনের হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও থেমে থাকেনি। তারা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ হাইফা বন্দরে। সেখানে তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায়। হামলার অভিঘাত শুধু হাইফাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, অন্য শহরেও আঘাতের খবর পাওয়া গেছে।
এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো পক্ষই দুর্বলতা দেখাতে চাইছে না। সামরিক শক্তির প্রদর্শন, প্রতিশোধের ভাষা, এবং প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এ যুদ্ধ আর শুধু দুই দেশের লড়াই নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জড়িয়ে ফেলা এক অগ্নিগর্ভ বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।
হিজবুল্লাহর প্রবেশ: ইসরায়েলের জন্য নতুন চাপ
এই সংঘাতে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে হিজবুল্লাহ। লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করছে। গতকাল সোমবার আলজাজিরার বরাত দিয়ে জানা যায়, লেবাননের বেইত লিফ এলাকায় হিজবুল্লাহর হামলায় কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা হতাহত হয়েছেন। সেখানে সেনাদের অবস্থান করা একটি বাড়ি গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে সংগঠনটি।
শুধু সীমান্তবর্তী এলাকা নয়, হিজবুল্লাহ হাইফা বন্দরেও হামলার দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল ‘উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের ধারাবাহিক হামলা’। এ ধরনের দাবি সত্য হোক বা না হোক, এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব যে বিশাল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন এখন কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং লেবাননও এই সংঘাতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের একটি চেকপোস্টে ইসরায়েলের বিমান হামলায় এক সেনা নিহত হয়েছেন এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ পরিস্থিতি এখন এমন, যেখানে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে এক দেশের সীমানা থেকে আরেক দেশে, এবং এতে নতুন নতুন পক্ষ জড়িয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ-ঝুঁকির সামরিক পরিকল্পনা: লক্ষ্য ১ হাজার পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরান থেকে প্রায় ১ হাজার পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উত্তোলনের লক্ষ্যে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানের কথা বিবেচনা করছে। এই তথ্য সামনে আসার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কারণ এমন কোনো অভিযান শুধু সামরিক দিক থেকেই জটিল নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও তা বিপজ্জনকভাবে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীকে কয়েকদিন ধরে ইরানের ভূখণ্ডের ভেতরে কাজ করতে হতে পারে। এর অর্থ হলো, তাদেরকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে প্রেসিডেন্টের হাতে যাতে একাধিক বিকল্প থাকে, সেই প্রস্তুতি চলছে।
এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা হবে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বিস্ফোরক সামরিক পদক্ষেপ। কারণ ইরানের ভেতরে ঢুকে এ ধরনের অভিযান মানে সরাসরি সংঘর্ষের নতুন দরজা খুলে দেওয়া। এতে শুধু যুদ্ধ তীব্র হবে না, পুরো অঞ্চল অনিশ্চয়তার আরও গভীর খাদে পড়ে যেতে পারে।
স্টারমারের বার্তা: “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়”
যুদ্ধ যখন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তখন কিছু দেশ প্রকাশ্যে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য ইরানে সেনা পাঠাবে না। তিনি বলেছেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ নয়, এবং আমরা এতে জড়াতে যাচ্ছি না।”
এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পশ্চিমা জোটের ভেতরে কে কতদূর পর্যন্ত যাবে, সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। স্টারমার জানান, ব্রিটেন সরাসরি যুদ্ধে নামবে না, তবে ব্রিটিশদের জীবন, ব্রিটিশ স্বার্থ এবং এ অঞ্চলে তাদের মিত্রদের রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে থাকবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাজ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
এর অর্থ স্পষ্ট—ব্রিটেন একদিকে সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।
হাইফায় আগুন: ইরানের আঘাতে জ্বলল তেল শোধনাগার
ইরানের হামলায় ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফার বাজান তেল শোধনাগারে আগুন লাগার ঘটনা যুদ্ধের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তেল শোধনাগার শুধু অবকাঠামো নয়; এটি একটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পকারখানা এবং সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
খবর অনুযায়ী, ১৯ মার্চও ইরান ওই স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। আবারও সেখানে আগুন লাগার ঘটনা দেখাচ্ছে, এ ধরনের হামলা একবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং কৌশলগতভাবে জ্বালানি অবকাঠামোকে অক্ষম করার চেষ্টা চলছে। একই বন্দরে গতকাল হিজবুল্লাহও হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।
এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য কেবল সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ তেল শোধনাগার ও বন্দর ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল, বাণিজ্যিক পরিবহন এবং জ্বালানি দামে।
ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি: আহত ২৬১ সেনা, ৬ হাজারের বেশি মানুষ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের ২৬১ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তবে এখনো কতজন সেনা নিহত হয়েছেন, সেই সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। এক দিনেই অন্তত ২৩২ জন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
শুধু তাই নয়, দক্ষিণ লেবাননে তিনটি আলাদা ঘটনায় ইসরায়েলের ছয় সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। দুই সেনা ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন। আরও তিনজন ড্রোন হামলায় এবং অপর একজন একটি সামরিক দুর্ঘটনায় আহত হন।
এর পাশাপাশি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের ৬ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের চাপ এখন শুধু সামরিক ব্যারাকে নয়; তা ছড়িয়ে পড়েছে হাসপাতাল, শহর, পরিবার এবং দৈনন্দিন জীবনে।
উপসাগরীয় দেশগুলোও হামলার মুখে
এই সংঘাত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ সরাসরি হামলার অভিঘাত অনুভব করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত গতকাল এক দিনেই ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৭টি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা মোট ১ হাজার ৯৪১টি ড্রোন ও ৪৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
একই সময়ে বাহরাইনেও আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ও সাতটি ড্রোন ছোড়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ১৮২টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৯৮টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
এই দুই দেশের পরিসংখ্যান শুধু তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাই দেখায় না; এটি আরও বড় এক বার্তা দেয়—যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তের লড়াই নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। কুয়েতে হামলায় গতকাল এক ভারতীয় কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও দেখায়, এই সংঘাতের শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষও।
বাগদাদের কাছে ‘ভিক্টরি বেস’ ঘাঁটিতে হামলা
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গতকাল সোমবার ভোরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে জানা যায়, এগুলো ড্রোন নয়; বরং বাগদাদ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মার্কিন ‘ভিক্টরি বেস’ ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া রকেটের শব্দ। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব রকেট ঠেকাতে পারেনি।
রকেটের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইরাকি স্পেশাল ফোর্সের একটি ‘এ৩২০বি’ পরিবহন উড়োজাহাজে আগুন ধরে যায়। এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখিয়ে দেয় যে মার্কিন স্বার্থ ও স্থাপনাগুলো এখন শুধু ইরান বা লেবানন নয়, ইরাকেও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—একটি হামলার জবাব আরেকটি দেশে গিয়ে পড়ছে। ফলে অঞ্চলজুড়ে যে বিস্ফোরক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
ট্রাম্পের হুমকি: বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলকূপ, খার্গ দ্বীপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে ইরানের বেসামরিক বিদ্যুৎ স্থাপনা, তেলকূপ এবং খার্গ দ্বীপে হামলা চালানো হবে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, তেহরান দ্রুত কোনো চুক্তিতে না এলে এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবসার জন্য খুলে না দিলে, যুক্তরাষ্ট্র আর “সুন্দর” থাকবে না।
ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের “সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেলকূপ ও খার্গ দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে” দেওয়া হবে। এরকম বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বার্তা নয়; এটি সরাসরি এক ধরনের সামরিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক চাপ নয়, ইরানের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
এই ধরনের ঘোষণার ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। কারণ একদিকে আলোচনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে অবকাঠামো ধ্বংসের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
“১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমা মেরেছি”: ট্রাম্পের আরেক বিস্ফোরক দাবি
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তাদের হাতে এখনো প্রায় তিন হাজার লক্ষ্যবস্তু বাকি রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তারা ইতোমধ্যে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমা মেরেছেন, এবং আরও কয়েক হাজার বাকি আছে। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেছেন, খুব দ্রুত একটি চুক্তি হতে পারে।
এই দ্বৈত অবস্থান—একদিকে ভয়াবহ সামরিক ভাষা, অন্যদিকে সম্ভাব্য চুক্তির ইঙ্গিত—পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কারণ এতে বোঝা যায়, যুদ্ধ এবং আলোচনাকে একসঙ্গে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি ইরানের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। পাশাপাশি খার্গ দ্বীপের রপ্তানি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণও ওয়াশিংটনের হাতে দেখতে চান। এই বক্তব্য কেবল নিরাপত্তা নয়, সম্পদ-ভিত্তিক কৌশলগত স্বার্থের দিকটিও সামনে নিয়ে আসে।
স্পেনের ‘না’: আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র
স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিতা রোব্লেস জানিয়েছেন, ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমান স্পেনের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। একই সঙ্গে স্পেনের সামরিক ঘাঁটিও ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে জরুরি ফ্লাইটগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
এই অবস্থান পশ্চিমা কূটনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ সব মিত্র দেশ যে এক অবস্থানে নেই, সেটি এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্পেনের সিদ্ধান্তের অর্থ, যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হতে পারে, যা সামরিক পরিকল্পনায় নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ইরানের অবস্থান: সরাসরি আলোচনা হয়নি, ১৫ দফা দাবি অযৌক্তিক
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেছেন, তেহরান এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা করেনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা দাবি ‘অযৌক্তিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যে বার্তাগুলো এসেছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবস্থান বারবার বদলানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইরান শুরু থেকেই নিজের অবস্থানে স্পষ্ট। তাদের কাছে যে প্রস্তাব পৌঁছানো হয়েছে, তা অতিরিক্ত এবং গ্রহণযোগ্য নয়। পাকিস্তানে যে বৈঠক হয়েছে, সেটিকেও ইরান নিজেদের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মানছে না।
এই বক্তব্য ইঙ্গিত করে, আলোচনার সম্ভাবনার কথা যতই বলা হোক, বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনো গভীর। আর এই আস্থাহীনতা থেকেই যুদ্ধবিরতির পথ বারবার আটকে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা, চীনের সমর্থন
যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তান সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আজ চীন সফরে যাচ্ছেন। ইসলামাবাদ গত এক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে একটি চতুর্পক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। লক্ষ্য—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে আনা।
চীন ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলাপের কথা বলেছেন। তিনি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে প্রশ্ন হলো, এই কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে? কারণ সামরিক ভাষা যত আক্রমণাত্মক হচ্ছে, আলোচনার জায়গা ততই সংকুচিত হচ্ছে। তবু এই প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্তত কিছু দেশ এখনো যুদ্ধের বদলে আলোচনার টেবিলকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে।
নজরদারিতে বড় ধাক্কা: রাডার বিমান ধ্বংস
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ রাডার বিমান ধ্বংস হওয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নজরদারি সক্ষমতার জন্য বড় আঘাত হতে পারে। সিএনএনের বিশ্লেষণ করা ছবিতে দেখা গেছে, বিমানটির লেজ ভেঙে গেছে এবং ওপরের বিশেষ গোলাকার রাডারটি মাটিতে পড়ে আছে।
এই রাডার ব্যবস্থা এডব্লিউএসিএস কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূর থেকে হুমকি শনাক্ত করা, আকাশপথে আগাম সতর্কতা দেওয়া এবং সমন্বিত নজরদারি চালানোর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক। ফলে এ ধরনের একটি বিমান ধ্বংস হয়ে যাওয়া শুধু সামরিক ক্ষতি নয়; এটি পুরো অঞ্চলে মার্কিন কৌশলগত সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব দূরদেশেও: ফিলিপাইনে ৩৬৫টি স্টেশন বন্ধ
এই যুদ্ধের অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়ছে। ফিলিপাইনে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে ৩৬৫টি জ্বালানি স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। ফিলিপাইন ন্যাশনাল পুলিশের পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত—মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ মানে শুধু সীমান্তে বোমা নয়; এর অর্থ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ, এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যয় বেড়ে যাওয়া। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই এই ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাত আরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: শান্তির পথ কোথায়?
সবকিছু মিলিয়ে এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে হামলা, পাল্টা হামলা, অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি; অন্যদিকে নানা দেশের মধ্যস্থতার চেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ থামানোর মতো কোনো দৃশ্যমান ঐক্য এখনো গড়ে ওঠেনি।
ইসরায়েল দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে সবচেয়ে বড় বাজেট পাস করেছে। ট্রাম্প নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ভাষা ব্যবহার করছেন। ইরান সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করছে। হিজবুল্লাহ নতুন করে চাপ বাড়াচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরোধে ব্যস্ত। আর বিশ্ববাজার জ্বালানি ঝুঁকির সংকেত পাচ্ছে।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি বড় হামলা, বা একটি ব্যর্থ প্রতিরক্ষা—যেকোনো কিছুই পুরো অঞ্চলকে আরও গভীর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে। কূটনীতি এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, কিন্তু যুদ্ধের শব্দ এত প্রবল যে শান্তির কণ্ঠস্বর খুব ক্ষীণ হয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর শুধু একটি সামরিক খবর নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সংকটের রূপরেখা। আর সেই কারণেই প্রশ্নটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি—এই আগুন থামাবে কে, এবং কবে?

