বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি জাহাজগুলোর জন্য নতুন একটি শুল্ক আরোপের বিল পাস করেছে ইরানের পার্লামেন্ট (মজলিস)। এই শুল্ক আদায়ের লক্ষ্য, প্রণালিটির নিরাপত্তা রক্ষা করা, যা ইরান এককভাবে বহন করে থাকে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সম্পর্কিত সংবাদ সংস্থা ফারস এই খবরটি প্রকাশ করেছে।
হরমুজ প্রণালি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যার মাধ্যমে পৃথিবীর মোট তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন হয়। এই সরু জলপথটি ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। প্রণালিটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি সারা বিশ্বের তেল বাজারের মূল ভিত্তি।
ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। এই ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিদেশি জাহাজগুলোর কাছ থেকে শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা করেছে ইরান। নীতিনির্ধারকদের মতে, হরমুজ প্রণালির একটি বড় অংশ ইরানের জলসীমার অন্তর্ভুক্ত এবং এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা করা ও পরিবেশ দূষণ রোধে দেশটির একক দায়িত্ব রয়েছে।
ইরান তাদের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ পারাপারের অধিকার একদিকে সকল দেশের হলেও, এই নির্দিষ্ট অঞ্চলে ইরানকে এককভাবে নিরাপত্তা প্রদান করতে হয়। এর ফলে, দেশটি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর এই নতুন ‘নিরাপত্তা কর’ আরোপ করতে যাচ্ছে।
তবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলি এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, ইরান এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলপথের ‘নিরুপদ্রব পারাপারের’ অধিকার লঙ্ঘন করছে।
ইরানের এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী তেলের দাম এবং নৌপরিবহণ খরচে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাকের মতো দেশগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ইরান যদি এই শুল্ক আদায় শুরু করে, তবে তা এই দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিবিদরা এই নতুন শুল্কের পদক্ষেপকে বেশ উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহণের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তেল শিল্পে এক বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের এই পদক্ষেপ কি প্রকৃতপক্ষে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমুদ্র নিরাপত্তায় তার একক দায়িত্বের জন্য যুক্তিযুক্ত, নাকি এটি আন্তর্জাতিক জলপথের স্বাভাবিক গতিপথে এক ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে? এই বিতর্ক এখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। অনেকেই মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান পৃথিবীজুড়ে একটি নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছে, যা অন্য দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্ববাসী এখন চেয়ে রয়েছে, এই শুল্ক আদায়ের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং ইরান এর ফলে কোথায় দাঁড়িয়ে থাকবে তা দেখতে। এটি ভবিষ্যতে কি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন ধারার উদাহরণ হতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।

