২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ঐতিহাসিকভাবে আক্রমণ করেছে, যার ফলে সাধারণ নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ আঘাত নেমে এসেছে। হামলাগুলোর লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা, কিন্তু শিকার হয়েছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বসতবাড়ি, শক্তি প্ল্যান্ট, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ অপরিহার্য নাগরিক অবকাঠামো। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখো মানুষের জীবন, এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসব হামলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের উপর হামলা
যুদ্ধের প্রথম দিনেই, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মিনাব শহরের শাজারেহ তায়েবেহ (দ্য গুড ট্রি) নামক প্রাথমিক বিদ্যালয় লক্ষ্য করে মার্কিন হামলা চালানো হয়। এই হামলায় কমপক্ষে ১৭০ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েরা। হামলার প্রমাণে দেখা গেছে যে, একটি মার্কিন টোমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল, যা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে আক্রমণ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার দায় অস্বীকার করেছেন, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই হামলাকে পরিকল্পিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাকৃত আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই হামলা ইরানের প্রতি আঘাত হিসেবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ১ মার্চ, ইরান ইসরায়েলকে আক্রমণ করে, যার ফলে ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে ৯ জন নিহত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা: শিক্ষা খাতের বিপর্যয়
২৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে, ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, তেহরান, ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলার শিকার হয়। যদিও এখনও ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত হয়নি, তবে ইরান দাবি করেছে যে এটি ইসরায়েল-মার্কিন হামলার ফলস্বরূপ। এর পরপরই, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) ঘোষণা করে যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এ ছাড়া, ২৯ মার্চ, ইরান একটি নতুন ঘোষণায় জানায় যে তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত। এই হামলা একদিকে যেমন ইরানের শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী শিক্ষাবিষয়ক আলোচনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

শক্তি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে আঘাত
শক্তি খাতে আক্রমণগুলি যুদ্ধের একটি অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে। ৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে, ইসরায়েল প্রথমবারের মতো ইরানের তেল ক্ষেত্রগুলোতে হামলা চালায়, যার মধ্যে তেহরানের আগদাসিয়েহ তেল গুদাম এবং শাহরান তেল ডিপো ছিল। হামলায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয় এবং ব্যাপক তেল ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
১৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে, ইসরায়েল ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রটিতে হামলা চালায়, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইসরায়েল দাবি করে যে তারা এসব স্থাপনা আক্রমণ করেছে কারণ এগুলো মিলিটারি সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যদিও এই দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তারা উপস্থাপন করেনি।
পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত
মধ্যপ্রাচ্যের পানি সংকট দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে, এবং সেখানে বড় অংশ জুড়ে ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান অভিযোগ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে তার একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এছাড়া, ৮ মার্চ, বাহরাইন সরকারও জানিয়েছে যে, ইরানের ড্রোন হামলা একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা পানি সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে।
ইরানের পাল্টা আক্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা
ইরান পাল্টা আক্রমণ করে যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে। কুয়েত, বাহরাইন, আরব আমিরাত, এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলিতে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ২০ মার্চ, কুয়েতে একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালানো হয়, যা এক ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ হয়। কুয়েত সরকার জানায় যে, এ হামলা প্ল্যান্টের কিছু অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
এদিকে, সৌদি আরবও এই হামলার শিকার হয়ে ২ মার্চ তাদের বৃহত্তম তেল রিফাইনারি রাস তানুরা বন্ধ করে দেয়। এই হামলার ফলে সৌদি আরবের তেল রফতানি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, যা বৈশ্বিক তেল বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের উপর আঘাত
এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল শারীরিক অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১১ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ইসরায়েল ইরানের একটি ব্যাংকে আক্রমণ চালায়। ইরান দাবি করে, এটি একটি অবৈধ ও অস্বাভাবিক হামলা। IRGC পরবর্তীতে ঘোষণা করেছে যে তারা আর্থিক সেন্টার এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছে।
এছাড়া, ১ মার্চ, ইরান একটি আমাজন ডেটা সেন্টার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি স্থাপনায় আক্রমণ চালায়। এই হামলাগুলোর ফলে গ্লোবাল ক্লাউড কম্পিউটিং সার্ভিসগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যার ফলে বহু ওয়েবসাইট এবং প্রযুক্তি সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
মানবিক বিপর্যয়: যুদ্ধের প্রভাব
এই হামলাগুলি শুধু শারীরিক অবকাঠামো এবং শক্তি প্ল্যান্টকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং সাধারণ মানুষের জীবনও চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ প্ল্যান্ট, শক্তি অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ যুদ্ধকে আরও অমানবিক করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের দেশগুলোতে নয়, বরং সারা বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এই আক্রমণগুলির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, এবং একে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করছে। এসব হামলার মূল লক্ষ্য মানুষ, তাদের জীবনযাত্রা এবং অবকাঠামো—যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং শান্তির জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

