ইরান যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একযোগে আক্রমণ চালায়, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তাদের পরিকল্পনাগুলো একেবারে বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইসরায়েল ভেবেছিল যে, তারা খুব সহজেই এই যুদ্ধের মধ্যে বিজয় অর্জন করবে, কিন্তু এখন এক মাস পর তা অনেকটা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও যুদ্ধের এক মাসের মধ্যে অনেক সফলতার দাবি করা হয়েছে, তবে ইসরায়েলের মিডিয়ায় এখন শোনা যাচ্ছে যে তাদের শক্তিশালী ও অবিস্মরণীয় অনুভূতি আস্তে আস্তে পরাজয়ের শুরুর দিকে এগোচ্ছে।
ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধ এবং পরিকল্পনার ব্যর্থতা
২০২৬ সালের ২৫ মার্চ, ‘ইয়েদিয়থ আহারনোথ’ পত্রিকায় যশি ইয়েহোশুয়া এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন যেখানে তিনি ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদের প্রধান ডেভিড বারনিয়ার মধ্যে বিরোধের কথা তুলে ধরেন। মোসাদ প্রধান বারনিয়া জানিয়ে ছিলেন যে, ইরানের সরকার পতনের পর বিদ্রোহ শুরু করার জন্য তার একটি পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সেই পরিকল্পনাটি এখন বাস্তবায়িত হয়নি। নেতানিয়াহু এবং বারনিয়া একে অপরকে দোষারোপ করার পাশাপাশি পরিকল্পনার ব্যর্থতার জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন।
এদিকে, ইসরায়েল সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়াল জামির এক সতর্কবার্তায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সামরিক বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে যদি মানবশক্তির অভাব মোকাবেলা করা না যায়।
প্রথমদিকে উল্লাস, এখন বিপর্যয়
যুদ্ধ শুরুর সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ একে একটি ঐতিহাসিক জয় হিসেবে দেখেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সমন্বয় ছিল একেবারে “অপ্রত্যাশিত” এবং “ঐতিহাসিক”, যার মধ্যে দুইটি বৈঠক এবং ১৫টি ফোন কল ছিল। দুই দেশের যৌথ বাহিনী ভারী বোমাবর্ষণ, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা, এবং ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং তেল গুদাম ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়।
তবে, যুদ্ধের এক মাস পরও ইসরায়েলের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চলছে। ইরান প্রতিদিন ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। যদিও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ব্যাপক সেন্সরশিপ করা হচ্ছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণের তথ্য ফাঁস হয়েছে, যেমন ডিমোনার পারমাণবিক রিএক্টর, হাইফা তেল শোধনাগার এবং বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর।
ইসরায়েলের জনজীবন এবং অর্থনীতি
যুদ্ধের প্রভাবে ইসরায়েলি জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চার সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলিরা বোমা আশ্রয়ে বা নিরাপদ স্থানে ছুটে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে, স্কুল এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। ইসরায়েল নড়বরে, কিন্তু এটি এখনো পতিত হয়নি।
ইরানের প্রতিরোধ এবং হিজবুল্লাহর নতুন যাত্রা
ইরানের সামরিক প্রতিরোধ সেসব কিছু ছিল যা পূর্বে কেউ আশা করেনি। একদিকে, ইসরায়েল যুদ্ধে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও, অন্যদিকে ইরান তার শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং প্রতিদিনই ভয়াবহ আঘাতের মুখে পড়ছে। একসময় হিজবুল্লাহকে অনেকটাই পরাজিত বলে মনে করা হয়েছিল, কিন্তু এখন তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর মিসাইল এবং স্থানীয় প্রতিরোধ শুরুর পর, ইসরায়েলি পক্ষের মধ্যে বিশাল হতাশা দেখা দিয়েছে।
সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনার অভাব
ইসরায়েলের ইতিহাসে এটি একটি নতুন অধ্যায় যেখানে তাদের সামরিক শক্তি অপরাজেয় হওয়ার বিপরীতে, তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল থাকা এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা ইসরায়েলকে একটি বিপদজনক অবস্থানে ফেলেছে।
এমনকি, ইসরায়েলিরা একটি “গ্রেটার ইসরায়েল” ধারণার অধীনে তাদের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডকট্রিন চালাচ্ছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসন এবং প্যালেস্টাইনির জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনা প্রবল হচ্ছে।
ইসরায়েলের জন্য বিপদজনক ভবিষ্যৎ?
এখন প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনা কি ভুল ছিল? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরায়েলের অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং যুদ্ধে তাদের নিজস্ব পরিকল্পনার অভাব তাদের পরিণতি আরও কঠিন করে তুলবে। এটি এমন একটি মিশ্রণ হতে পারে যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশ্ববাসী এখন উদ্বিগ্ন, তবে ইসরায়েল যেন আরও একবার ভুলে না যায় যে, সামরিক শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনার অভাব কোনও জাতির জন্য স্থায়ী বিজয় বয়ে আনতে পারে না।

