ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। ২০০০ সালের পর থেকে ইরান তাদের পারমাণবিক পরিকল্পনার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি মন্তব্য করেছে, যার মধ্যে প্রধান ছিল তাদের দাবি, এটি কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং তাদের লক্ষ্য কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা নয়। এই নিশ্চিতকরণের জন্য, তখনকার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন, যেখানে পরমাণু অস্ত্র তৈরিকে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে গত কয়েক বছর ধরে, ইরানের পরমাণু পরিকল্পনা এবং খামেনির দেয়া এই ফতোয়ার উপর নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর, ইরানে এই বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আর তার কারণ, খামেনির মৃত্যুর পর তার দেওয়া ফতোয়া এখন আর হয়তো আগের মতো কার্যকর থাকবে না।
গত কয়েক দশক ধরে ইরান এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা ছিল। এর এক বড় কারণ ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির দিকে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের তীক্ষ্ণ নজরদারি। বিশেষ করে, ইরান যখন বলছিল যে তাদের পরমাণু কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছিল। ইরানি জনগণের মধ্যে অনেকেই চাইছিল যে দেশটি আরও দ্রুত পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যাক। তবে এই চাপ সত্ত্বেও, খামেনি তার ফতোয়া দিয়ে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি ইসলামের বিরুদ্ধে এবং এটি হারাম।
গবেষকরা এখন মনে করছেন যে খামেনির মৃত্যুর পর তার দেয়া এই ফতোয়া আর তেমন কার্যকর থাকবে না। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের গবেষক ত্রিতা পারসি সিএনএনকে জানান, “নিউক্লিয়ার ফতোয়া মারা গেছে,” এবং তিনি আরো বলেন, “এ বিষয়ে ইরানী জনগণের মনোভাব ও অভিজাত শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ইরানের জনগণের মধ্যে এক ধরনের চাপ রয়েছে, যেটি তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে প্ররোচিত করছে। ইরানি জনগণ, বিশেষ করে তাদের অভিজাত শ্রেণি, ইরানকে পারমাণবিক শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। তবে, খামেনির নীতি ছিল “কৌশলগত ধৈর্য”, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া ধীরগতিতে পরিচালনা করতেন।
২০১৮ সালে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন, তখন ইরান এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থান নেয়, কিন্তু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পরও খামেনি পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে অস্বীকার করেননি। এতে তিনি তার দেশবাসীকে বারবার জানিয়ে দিয়েছেন যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি তাদের কাছে একটি নিষিদ্ধ বিষয়।
এখনকার পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক, কারণ ইরান সম্প্রতি তার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে। এর ফলে, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির দাবিটি এখন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে তারা সহজেই একটি প্রাথমিক (ক্রুড) নিউক্লিয়ার ডিভাইস তৈরি করতে পারে।
এর আগে, ইরান যে “কৌশলগত ধৈর্য” দেখিয়েছিল, তা এখন কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। ইরান ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা তাদের পরমাণু অবস্থান পরিবর্তন করতে প্রস্তুত। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুর আগে, ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করেছিল যে ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করছে।
সিনা আজোদি, ‘ইরান অ্যান্ড দ্য বোম্ব: দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, ইরান অ্যান্ড দ্য নিউক্লিয়ার কোয়েশ্চন’ বইয়ের লেখক, বলেন, “ইরান যদি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৈরি করতে সক্ষম হয়, তবে তারা একটি অত্যাধুনিক পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করে প্রাথমিকভাবে একটি সাধারণ নিউক্লিয়ার ডিভাইস তৈরি করার দিকে যেতে পারে।”
এমন পরিস্থিতিতে, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যায়, তবে রিয়াদ (সৌদি আরব) হতে পারে পরবর্তী দেশ যেটি পরমাণু বোমা তৈরির দাবি তুলবে, বিশেষ করে যদি ইরান তাদের পরমাণু সক্ষমতা আরও উন্নত করে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, খামেনির মৃত্যু এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে যে পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা আছে, তা বাস্তবিকভাবে কিভাবে সামাল দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে, ইরান তার পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে। তবে এটা স্পষ্ট যে, এখন পর্যন্ত পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে ইরান কিছুটা অগ্রসর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরো শক্তিশালী হতে পারে।

