বর্তমানে ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। এক মাস ধরে চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ শুরু হয়নি, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনী সেখানে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা তাদের পূর্ণ আক্রমণের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিতে পারে। ইরানে মার্কিন বাহিনী কী ধরনের পরিকল্পনা করছে এবং ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কী বলছে? চলুন, এক নজরে দেখে নেয়া যাক এই সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি।
মার্কিন সেনার নতুন প্রস্তুতি
গত কয়েকদিন ধরে মার্কিন সেনা বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে আরও সৈন্য পাঠিয়েছে, এবং এখন তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানে সীমিত ভূ-অপারেশন চালানো। বিশেষ করে, ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলা এবং হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আক্রমণের জন্য সেনারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। খার্গ দ্বীপ, যেটি ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র, প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়া করে, এবং এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ যদি আমেরিকার হাতে চলে আসে, তাহলে ইরানের তেল রপ্তানির বড় ক্ষতি হতে পারে।
খার্গ দ্বীপের উপকূল ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানির অঞ্চল। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহের মূল পথ, সেখানে মার্কিন বাহিনী কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চাইছে। এই প্রণালী দিয়ে দিনে প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ হয়। কিন্তু গত মাসে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু চীনা, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো আন্তর্জাতিক জাহাজকে সেখানে নিরাপদ যাত্রা করতে দেয়া হয়নি, যা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১১৬ ডলারে পৌঁছে গেছে। বিশ্বব্যাপী এই মূল্যবৃদ্ধি মূলত ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব।
ট্রাম্পের সামরিক পরিকল্পনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য বলছেন, তিনি চান “ইরানের তেল নিয়ে আসতে” এবং তিনি খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি গত রোববার জানিয়েছিলেন, “আমরা খার্গ দ্বীপ নিতে চাই, অথবা হয়তো না, আমাদের অনেক অপশন রয়েছে।” এর আগে, ১৪ মার্চ, মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর বোমা হামলা চালিয়েছে এবং ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখলে ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল সুবিধাগুলোকে টার্গেট করা হতে পারে।
ইরানও তীব্র প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, “আমরা অপেক্ষা করছি, যাতে আমেরিকান সেনারা আমাদের মাটিতে পা রাখলেই তাদের আগুনে ভস্মীভূত করতে পারি।” ইরান তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোকেও হুমকি দিয়েছে, যারা মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় আসতে পারে।
মার্কিন বাহিনী কতটা প্রস্তুত?
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাহিনী বর্তমানে পুরো ইরানে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে না, বরং তারা সীমিত, কৌশলগত আক্রমণের দিকে মনোনিবেশ করেছে। এর মধ্যে, বিশেষ বাহিনী এবং ফাইটার জেট ব্যবহার করে ছোট দ্বীপগুলোর ওপর আক্রমণ চালানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত, ৭,০০০ এরও বেশি মার্কিন সেনা উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছেছে এবং আরও ১০,০০০ সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অথচ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন বাহিনী প্রায় ১৫০,০০০ সেনা এবং ২৩,০০০ অন্য দেশের সেনা নিয়ে ইরাক আক্রমণ করেছিল। তাই বর্তমানে, প্রায় ১৭,০০০ মার্কিন সেনার উপস্থিতি কোনো পূর্ণ আক্রমণের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বাহিনীগুলো শুধুমাত্র সীমিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত।
ভূ-অপারেশন: কোন কোন সম্ভাবনা রয়েছে?
মার্কিন সেনারা এখন এমন কিছু এলাকায় আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছে, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান দুটি অপশন হলো:
১. খার্গ দ্বীপ
খার্গ দ্বীপ ইরানের অপরিশোধিত তেলের মূল রপ্তানি কেন্দ্র এবং আমেরিকা এর নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। এই দ্বীপের ওপর হামলা চালালে, তেলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য বলছেন, “খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে আসলে আমাদের সেখানে কিছু সময় থাকতে হবে, কারণ এর গুরুত্ব অনেক।”
২. কেশম দ্বীপ
কেশম দ্বীপ, যা হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত, এটি খুবই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ইরানের “মিসাইল শহর” রয়েছে, যা মূলত হরমুজ প্রণালীকে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। ৭ মার্চ, মার্কিন বাহিনী কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়ে এখানে থাকা একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট ধ্বংস করেছে, যার ফলে ৩০টি গ্রামের পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ইরান এই হামলাকে “একটি বড় অপরাধ” হিসেবে অভিহিত করেছে।
৩. ইউরেনিয়াম মজুদ
অন্য একটি পরিকল্পনা হলো, মার্কিন বাহিনী ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদগুলি ধ্বংস করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরান থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম বের করার পরিকল্পনা করছেন, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়।
আক্রমণের পরিণতি কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাহিনী ইরানে একটি বড় ধরনের আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে না, বরং তারা সীমিত আক্রমণ এবং দ্রুত বাহিনী প্রত্যাহারের দিকে মনোনিবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করতে সহায়ক হতে পারে, এবং তার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়া, মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি ইরানকে চাপে রাখতে এবং পরবর্তীতে আলোচনা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে, যদি মার্কিন বাহিনী ইরানে বৃহৎ আক্রমণ চালায়, তবে তা হবে একটি বিপজ্জনক এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ, যা আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।

