মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে এক মাসব্যাপী চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান এখন ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতায় না গেলেও, তাদের পদক্ষেপগুলোতে একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে: তারা এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নীতি অব্যাহত রাখার পক্ষপাতী নয়।
ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় দেশগুলো স্পষ্টভাবে নিজেদের সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করার চেষ্টা করছে, যা একদিকে কৌশলগতভাবে তাদের অবস্থানকে পরিষ্কার করে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কঠিন বার্তা দেয়।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে, তারা ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী বিমানের তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এটি সংঘাতের শুরু থেকেই ফ্রান্সের এক ঐতিহাসিক অবস্থান ছিল, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ফ্রান্সকে ‘অসহযোগী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই ঘটনাটি ওয়াশিংটন-প্যারিস সম্পর্কের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বৃদ্ধি করেছে।
ইতালি, যদিও সরাসরি বিরোধিতা করেনি, তবে সিসিলির সিগোনেলা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমানের অবতরণের অনুমতি দেয়নি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী একথা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে, তবে এটি পূর্বনির্ধারিত চুক্তির বাইরে হলে আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে ইতালি নিজের শর্ত আরোপ করেছে।
স্পেন আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে ইরানে হামলায় জড়িত মার্কিন বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কঠোর সমালোচক ছিলেন, এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কেবল ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে।
এই পদক্ষেপগুলোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ‘অসহযোগী’ এবং ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ইউরোপ পাশে দাঁড়ায়নি, এবং এমনকি যুক্তরাজ্যকে কটাক্ষ করেছেন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য।
তবে ইউরোপের এই অবস্থান শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং, এটি আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন। যেমন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদ রক্ষা করতে গিয়ে কোনো দেশের ভয় পাওয়ার কারণ নেই।’ এটি ইউরোপের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যা শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করে।
এদিকে, জার্মানি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের রামস্টেইন ঘাঁটি ব্যবহারে কোনো বাধা দেয়নি, তবে পরবর্তীতে দেশটির প্রেসিডেন্ট যুদ্ধটিকে ‘অবৈধ’ বলে মত দেন, যা ইউরোপের মধ্যে নীতিগত বিভাজন সৃষ্টি করে।
ইউরোপ সরাসরি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান না জানালেও, তাদের এই পদক্ষেপগুলো ইঙ্গিত দেয় যে তারা কোনোভাবেই একতরফাভাবে শক্তি প্রয়োগে সহায়তা করতে রাজি নয়। বরং, তারা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সংযম প্রদর্শনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই অবস্থান ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে, আবার ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপের এই পদক্ষেপের ফলস্বরূপ কি যুদ্ধ থামানোর দিকে এক নীরব চাপ তৈরি হচ্ছে, নাকি এটি শুধুমাত্র সতর্ক সংকেত?
এখনো প্রশ্নটা রয়েছে, ইউরোপ কি এই যুদ্ধের শেষ দিকে চাপ সৃষ্টি করছে, নাকি কেবল একটি সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে চাচ্ছে?

