টানা ৩৩ দিন ধরে চলছে হামলা। আকাশপথে একের পর এক আঘাত—মিসাইল, ড্রোন, যুদ্ধবিমান—সবই ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবুও যুদ্ধ যেন শেষের দিকে নয়, বরং আরও জটিল দিকে এগোচ্ছে।
কারণটা পরিষ্কার—এই দীর্ঘ সময়ের বিমান হামলা সত্ত্বেও মূল লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরানের সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে, কিছু ঘাঁটি দুর্বল হয়েছে, কিন্তু দেশটির কৌশলগত শক্তি—বিশেষ করে পারমাণবিক সক্ষমতা—পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
এই বাস্তবতায় এখন নতুন আলোচনা—স্থলযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সীমিত পরিসরে হলেও ইরানের ভেতরে সেনা নামানোর পরিকল্পনা করছে।
এটি বাস্তব হলে যুদ্ধের চরিত্র একেবারেই বদলে যাবে।

কেন হঠাৎ স্থল অভিযানের চিন্তা
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কেন যুক্তরাষ্ট্র এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়টি। ধারণা করা হয়, দেশটির হাতে ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমানের ইউরেনিয়াম রয়েছে।
এটি শুধু একটি সামরিক উপাদান নয়—এটি ক্ষমতার প্রতীক। এই মজুত যতদিন ইরানের হাতে থাকবে, ততদিন তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
এই কারণেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিকবার এই ইস্যুতে আপত্তি তুলেছেন। একইভাবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও বড় চাপের বিষয়।
অন্যদিকে, খারগ দ্বীপের গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এখান দিয়ে রপ্তানি হয়। এই দ্বীপ যদি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়—পুরো জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলা সম্ভব।
অর্থাৎ, এই স্থল অভিযান শুধু যুদ্ধ জয়ের জন্য নয়—বরং ইরানকে চাপ দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানে বাধ্য করার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সম্ভাব্য হামলার চিত্র: কোথা থেকে, কীভাবে
ইরানে সরাসরি ঢুকে পড়া সহজ কাজ নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এটি একটি কঠিন লক্ষ্য।
এই কারণে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই মূল ভূখণ্ডে হামলা না করে আশপাশের কৌশলগত জায়গাগুলো দখলের চেষ্টা করবে।
কেশম বা খারগ দ্বীপে অ্যাম্ফিবিয়াস হামলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই ধরনের অভিযানে সমুদ্র থেকে দ্রুত সৈন্য নামানো হয়, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট এলাকা দখল করা হয়।
এই অভিযান শুরু হতে পারে কাতারের আল উবেইদ ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত বা ইরাক থেকে। এসব জায়গায় আগে থেকেই মার্কিন সেনা ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রয়েছে।
এর মানে হলো—যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে হামলা শুরু করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
ইরানের সেনাবাহিনী: শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
সংখ্যার দিক থেকে ইরান দুর্বল নয়। তাদের সক্রিয় সেনা প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার। এর বাইরে রিজার্ভসহ মোট সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই বাহিনী আবার একক নয়—বরং কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ), বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি), বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী—সব মিলিয়ে একটি জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছে।
তবে সমস্যাও আছে। অনেক সেনা সীমিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, আর অস্ত্রের বড় অংশ পুরোনো। বিশেষ করে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানগুলোর অনেকই ১৯৭৯ সালের আগের বা সোভিয়েত আমলের।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়—ইরানের আসল শক্তি তাদের কৌশলে।
“মোজাইক প্রতিরক্ষা”: দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি
ইরান জানে, সরাসরি শক্তিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমান নয়। তাই তারা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে।
“মোজাইক প্রতিরক্ষা” নীতি অনুযায়ী দেশটিকে ছোট ছোট প্রতিরক্ষা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চল আলাদাভাবে যুদ্ধ চালাতে সক্ষম।
এর ফলে, কেন্দ্রীয় কমান্ড ধ্বংস হলেও যুদ্ধ থেমে যাবে না।
স্থলযুদ্ধ শুরু হলে ইরান প্রথমে প্রচলিত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে। এরপর ধীরে ধীরে গেরিলা কৌশলে চলে যাবে—যেখানে ছোট ছোট হামলা, অতর্কিত আক্রমণ, সরবরাহ লাইনে আঘাত—এসবই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠবে।
এই কৌশল আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল—এবং ইরান সেই অভিজ্ঞতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা: দ্রুত আঘাত, সীমিত সময়
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা মূলত দ্রুত আঘাত হানা।
তাদের বিশেষ বাহিনী—নেভি সিল, মেরিন, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন—এ ধরনের অভিযানে পারদর্শী।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা ছিল। এর সঙ্গে আরও প্রায় ৭ হাজার সেনা যোগ হয়েছে।
এই বাহিনীগুলো “লাইট ইনফ্যান্ট্রি”—অর্থাৎ তারা দ্রুত হামলা চালাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সবসময় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে না।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা যদি দ্রুত সাফল্য অর্জন করা হয়—তাহলে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সমস্যা বাড়বে।
অস্ত্র বনাম পরিবেশ: একটি অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ
মার্কিন সেনারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে—এম৪ কারবাইন, জ্যাভেলিন মিসাইল, স্টিংগার—সবই অত্যন্ত কার্যকর।
কিন্তু যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের উপর নির্ভর করে না।
ইরানের কঠিন ভৌগোলিক পরিবেশ—ধুলা, তাপ, পাহাড়ি এলাকা—এসবই যুদ্ধকে জটিল করে তোলে। এমনকি উন্নত অস্ত্রও এসব পরিবেশে কার্যকারিতা হারাতে পারে।
এটি এমন একটি বিষয়, যা অনেক সময় কৌশলগত পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলে।

যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব: কে কতটা টিকবে
এই যুদ্ধ শুধু গোলাবারুদের নয়—এটি ধৈর্যের লড়াই।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত ফলাফল চান। কিন্তু ইরান চাইবে যুদ্ধ দীর্ঘ করতে।
কারণ, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে:
- যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে
- আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে
- রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হবে
অন্যদিকে, ইরানের জনগণও বাহ্যিক হামলার মুখে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে—যা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
শেষ কথা: সামনে কী আসছে
সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্থলযুদ্ধ শুরু হলে এটি আর সহজ থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি ও শক্তিতে এগিয়ে, কিন্তু ইরান সময় ও কৌশলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
এই সংঘাত যদি মাটিতে গড়ায়, তাহলে তা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এটি একটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং জটিল যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
আর সেই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে পুরো বিশ্বে।

