ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরাজয় নিশ্চিত—এমনই দাবি করেছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি। দেশটির এই সংবাদমাধ্যম বলছে, বিশ্বের ৮০টি বড় থিংকট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গত এক মাসের প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামত খতিয়ে দেখে তাদের ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তাসনিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক শক্তি, উন্নত প্রযুক্তি এবং ধারাবাহিক আঘাত সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে সফল হয়নি। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ততই এই সংঘাতের চরিত্র বদলে গিয়ে তা এমন এক ক্ষয়িষ্ণু লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে, যেখানে সুবিধার পাল্লা ধীরে ধীরে ইরানের দিকেই ঝুঁকছে।
তাসনিমের বিশ্লেষণকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও, তাদের প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় বক্তব্যটি বেশ স্পষ্ট। তারা বলছে, যুদ্ধের আসল সাফল্য শুধু কতটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হলো, কতটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলো, বা কত দ্রুত আকাশে আধিপত্য কায়েম করা গেল—এসব দিয়ে মাপা যায় না। যুদ্ধের প্রকৃত মাপকাঠি হচ্ছে, প্রতিপক্ষকে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে সরানো গেছে কি না, রাষ্ট্রীয় কাঠামো নড়বড়ে করা গেছে কি না, কিংবা তাকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া গেছে কি না যেখানে সে কার্যত আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। তাসনিমের মতে, এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থমকে গেছে।
তাদের উপস্থাপনায় প্রথম যে বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, তা হলো প্রযুক্তিগত জয় আর কৌশলগত জয়ের পার্থক্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতার জোরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক হামলা চালাতে পেরেছে। অর্থাৎ, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাকটিক্যাল বা তাৎক্ষণিক কিছু সুবিধা আদায় করেছে। কিন্তু তাসনিমের মতে, এই সামরিক আঘাতগুলো শেষ পর্যন্ত সেই বড় লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, যেটি ছিল ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে নড়িয়ে দেওয়া, প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে অকার্যকর করে ফেলা, অথবা দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে নতি স্বীকারে বাধ্য করা। তাদের ব্যাখ্যায়, এখানে যুদ্ধের দৃশ্যমান সাফল্য আর বাস্তব কৌশলগত ফল এক জিনিস নয়।
দ্বিতীয় যে যুক্তিটি সামনে আনা হয়েছে, তা হলো ইরানের রাষ্ট্রীয় স্থিতি ও প্রতিরোধক্ষমতা। তাসনিম বলছে, বহুমুখী চাপের মুখেও তেহরান তার মূল কাঠামো অক্ষত রাখতে পেরেছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, প্রতিরক্ষার কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ভেঙে পড়েনি, এবং জনগণকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেওয়া যায়নি যেখানে তারা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। বরং এই যুদ্ধ, তাদের ভাষায়, ইরানের জন্য এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে; আর সে কারণেই দেশের ভেতরে প্রতিরোধের রাজনৈতিক বয়ান আরও জোরালো হয়েছে।
তৃতীয় বিষয়টি হলো হরমুজ প্রণালি এবং অপ্রতিসম যুদ্ধের কৌশল। তাসনিমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বুঝে গেছে যে সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই দেশটি এমন পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে সরাসরি সামরিক শক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কৌশল, চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্পর্শকাতর জায়গাগুলোকে কেন্দ্র করে চালানো অপ্রতিসম যুদ্ধ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাদের এই যুক্তিকে জোরদার করেছে। কারণ, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথকে কেন্দ্র করে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক বাজারকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। তাসনিমের দাবি, এখানেই ইরান যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ আংশিকভাবে নিজের হাতে নিতে পেরেছে।
চতুর্থত, তারা বলছে যুদ্ধটি এখন ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। এই ধরনের যুদ্ধে সব সময় সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী জেতে না; বরং যে পক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারে, প্রতিপক্ষের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে, এবং নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে, শেষ পর্যন্ত কৌশলগতভাবে সেই পক্ষই এগিয়ে যায়। তাসনিমের মতে, ইরান সেই পথেই এগোচ্ছে। তারা দেখাতে চেয়েছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তত বাড়ছে। অন্যদিকে ইরান এই দীর্ঘমেয়াদি লড়াইকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে আলোচিত উপসংহারটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রস্থানপথের সংকট। তাসনিম বলছে, যুদ্ধ থেকে দ্রুত বের হতে চাইলে ওয়াশিংটনের হাতে মূলত দুটি পথ খোলা আছে। হয় তাকে এমন একটি বয়ান দাঁড় করাতে হবে, যাতে তা অন্তত প্রচারণার পর্যায়ে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায়; নয়তো বাস্তব কোনো দৃশ্যমান জয় ছাড়াই যুদ্ধের ইতি টানতে হবে। তাদের মতে, এই দুইয়ের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার চাপ যত বাড়ছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে যে যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো পূরণ করা সহজ হয়নি।
এই বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ৮০টি থিংকট্যাংকের ভৌগোলিক বণ্টনও তাসনিম আলাদাভাবে তুলে ধরেছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি, যুক্তরাজ্যের ৮টি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের ১৮টি, এশিয়ার ৯টি, কানাডার ২টি, অস্ট্রেলিয়ার ৩টি, ল্যাটিন আমেরিকার ১টি এবং আফ্রিকার ৩টি প্রতিষ্ঠানের কনটেন্ট এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ১৪টি আন্তর্জাতিক বা বহুজাতিক সংস্থা। প্রতিবেদনে ব্রুকিংস, কার্নেগি, সিএফআর, র্যান্ড, সিএসআইএস, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আটলান্টিক কাউন্সিল, চ্যাথাম হাউস, আইআইএসএস, রুসি, ব্রুগেল, ইফরি, সিইপিএস, এসআইপিআরআই, জার্মান মার্শাল ফান্ড, সিআইসিআইআর, ওআরএফ, জেআইআইএ, কেডিআই, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতো নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই একবাক্যে বলেছে যে “যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরাজয় নিশ্চিত”? নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের ভাষা মূলত তাসনিমের নিজস্ব উপসংহার বা ব্যাখ্যা, সব থিংকট্যাংকের অভিন্ন শব্দচয়ন নয়। কারণ স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইরান একদিকে বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে আবার সে পুরোপুরি ভেঙেও পড়েনি। বরং তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, বিশেষ করে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করার ক্ষমতা এখনো তাকে একটি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
এই জায়গাটাই আসলে বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে জটিল দিক। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, শুধু সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেই কোনো রাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে পরাজিত বলা যায় না। যদি সেই রাষ্ট্র এখনো প্রতিরোধ করতে পারে, প্রতিপক্ষের খরচ বাড়াতে পারে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, এবং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে তুলতে পারে—তাহলে বাস্তব চিত্র অনেক বেশি জটিল হয়ে যায়। এপি-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরান সামরিকভাবে দুর্বল হলেও এখনো এক ‘stubborn foe’ বা জেদি ও কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে টিকে আছে। রয়টাতার লিখেছে, যুদ্ধটি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে কোনো সমঝোতা ছাড়া এর সমাপ্তি হলে ইরান উল্টো আরও বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে যেতে পারে।
তাসনিমের প্রতিবেদনের রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই। এটি শুধু একটি সামরিক রিপোর্ট নয়; এটি এমন এক বয়ান তৈরি করছে, যেখানে বলা হচ্ছে যে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র আর আকাশ-আধিপত্য থাকলেই শেষ কথা বলা যায় না। প্রতিপক্ষকে সত্যিকার অর্থে হারাতে হলে তার রাজনৈতিক স্নায়ু, সামাজিক সহনশক্তি, অর্থনৈতিক কৌশল, এবং আঞ্চলিক প্রভাব—সবকিছুকে একসঙ্গে নড়বড়ে করতে হয়। তাসনিমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। বরং ইরান যুদ্ধকে এমন এক পর্যায়ে টেনে এনেছে, যেখানে প্রতিপক্ষের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও কৌশলগত সাফল্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ কারণেই এই বিশ্লেষণ শুধু ইরানপন্থী প্রচারণা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়, আবার একে চূড়ান্ত সত্য বলাও কঠিন। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়—এই যুদ্ধে ফলাফল নির্ধারিত হচ্ছে শুধু বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র আর বিমান দিয়ে নয়; নির্ধারিত হচ্ছে ধৈর্য, অর্থনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক স্নায়ু-যুদ্ধ, এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতির মাধ্যমে। যে পক্ষ যত বেশি সময় ধরে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারবে এবং প্রতিপক্ষকে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সুবিধা সেদিকেই যেতে পারে।
সুতরাং, ০২ এপ্রিল ২০২৬-এর এই আলোচিত বিশ্লেষণকে এক কথায় বললে—তাসনিম দাবি করছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রাথমিক ও মূল লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পিছিয়ে পড়েছে, এবং ৮০টি থিংকট্যাংকের কনটেন্ট বিশ্লেষণ থেকে তারা সেই উপসংহার টেনেছে। তবে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, চিত্রটি সাদা-কালো নয়; ইরান ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু পরাস্ত নয়; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শক্তিশালী, কিন্তু নিরঙ্কুশ সফলও নয়। আর ঠিক এই ধূসর, অনিশ্চিত, বহুস্তরীয় বাস্তবতাই আজকের ইরান যুদ্ধকে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত করেছে।

