ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে কী করা উচিত—এই প্রশ্ন বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি আরও কঠিন, আরও বিপজ্জনক এবং আরও অস্বস্তিকর বিকল্প সামনে এসেছে: ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি দখল করা। তত্ত্বে বিষয়টি যতটা সরল শোনায়, বাস্তবে এটি ততটাই বিপজ্জনক। সামরিক বিশ্লেষক, সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অভিযানে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকি নয়, বরং রাসায়নিক, প্রযুক্তিগত, গোয়েন্দা, লজিস্টিক এবং ভূরাজনৈতিক—সব ধরনের সংকট একসঙ্গে বিস্ফোরিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে লক্ষ্যটি পরিষ্কার: ইরানকে এমন অবস্থায় যেতে না দেওয়া, যেখানে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্রমানের পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়। এই কারণেই শুধু বিমান হামলা বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করার কথা নয়, বরং ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার সরিয়ে নেওয়া বা অন্তত তা নিরাপদহীন করে দেওয়ার প্রশ্নও উচ্চপর্যায়ে উঠেছে। কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—এই কাজটি দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বা কয়েক ঘণ্টার কমান্ডো অভিযানে শেষ করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক অভিযান, যা বাস্তবে আংশিক দখল, আংশিক খনন, আংশিক বিশেষ সামরিক অপারেশন এবং আংশিক পারমাণবিক উদ্ধার মিশনে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম দখল করতে গেলে সেটি হবে প্রচলিত অর্থে “রেইড” নয়, বরং একটি বড় মাপের স্থল-অভিযান। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় এমনকি খননযন্ত্র উড়িয়ে নেওয়া, অস্থায়ী রানওয়ে তৈরি করা এবং রেডিওঅ্যাকটিভ উপাদান বের করে আনার মতো বিষয়ও ছিল। AP-র প্রতিবেদনে সাবেক মার্কিন আর্মি সেক্রেটারি ক্রিস্টিন ওয়ারমুথ বলেছেন, কেবল ইসফাহান ঘিরেই অপারেশন চালাতে সহজেই ১,০০০ জনের মতো সামরিক সদস্য লাগতে পারে। অর্থাৎ, এটি এমন কোনো অপারেশন নয় যেখানে কয়েকজন বিশেষ বাহিনীর সদস্য ঢুকে গিয়ে কাজ শেষ করে ফিরে আসবে।
এই পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলার প্রথম কারণ হলো অবস্থান-অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে ধারণা আছে যে ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইসফাহান, নাতাঞ্জ এবং সম্ভবত ফোরদোর মতো স্থাপনায় রয়েছে। কিন্তু সঠিকভাবে কতটা কোথায় আছে, তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। IAEA বহুদিন ধরে এই উপাদানের পূর্ণাঙ্গ যাচাই করতে পারেনি, আর সেটিই গোটা হিসাবকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, IAEA-র হিসেবে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল; এর একটি বড় অংশ ইসফাহানের কাছে সংরক্ষিত বলে ধারণা করা হয়, তবে বাকিটা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার মানে হলো, যদি ইউরেনিয়াম একাধিক স্থানে থাকে, তাহলে একটিমাত্র হামলা বা একক অভিযান যথেষ্ট হবে না। প্রতিটি জায়গার জন্য আলাদা প্রবেশপথ, আলাদা নিরাপত্তা, আলাদা উদ্ধার পরিকল্পনা এবং আলাদা প্রতিরক্ষা বলয় লাগবে। সামরিক ভাষায় এর অর্থ—প্রতিটি নতুন সাইট মানেই নতুন ঝুঁকি। আর যুদ্ধক্ষেত্রে “সম্ভবত” বা “ধারণা করা হয়” ধরনের তথ্যের ওপর অভিযান দাঁড় করানো সবসময়ই ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
দ্বিতীয় বড় বাধা হলো ভূগর্ভস্থ কাঠামো। ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর একটি অংশ বহু বছর ধরে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে সেগুলো সরাসরি বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতেও পুরোপুরি অচল না হয়ে পড়ে। রয়টার্স-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসফাহান কমপ্লেক্সের কিছু টানেল-প্রবেশপথ মাটি দিয়ে ঢেকে বা শক্তিশালী করে রাখা হয়েছে। AP-র প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে বন্ধ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে হেলিকপ্টারে করে ভারী যন্ত্রপাতি নিতে হতে পারে, এমনকি ভেতরে ঢোকার আগেই খননকাজ শুরু করতে হতে পারে। অর্থাৎ, অভিযান শুরুর আগেই সেনাদের একটি প্রকৌশল-নির্ভর লড়াইয়ে নামতে হবে।
এতে সমস্যা আরও একটি জায়গায় তৈরি হয়। খননযন্ত্র, ভারী সরঞ্জাম, নিরাপত্তা বলয়, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ—এসব কিছু করতে সময় লাগে। আর সময় যত বাড়ে, আক্রমণকারী বাহিনী তত বেশি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের অভিযান আর কয়েক দিনের অভিযান এক জিনিস নয়। শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে ঘাঁটি বানিয়ে কাজ করতে গেলে সরবরাহ, চিকিৎসা, বায়ু প্রতিরক্ষা, উদ্ধারপথ—সবকিছুই একসঙ্গে চালু রাখতে হয়। সামান্য ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থলযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি। ইসফাহান বা নাতাঞ্জের মতো জায়গা কেবল মানচিত্রের একটি বিন্দু নয়; এগুলো এমন এলাকা, যেখানে বিদেশি সেনা প্রবেশ করলে তা কার্যত সরাসরি স্থল-সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে। এপি ও ওয়াশিংটন পোস্ট—দুটো প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এ ধরনের মিশন কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে এবং হতাহতের আশঙ্কাও বাস্তব। যারা ভেতরে যাবে, তারা শুধু ইউরেনিয়াম উদ্ধার করবে না; তাদের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় গড়তে হবে, সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে হবে, এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
এমন অবস্থায় সবচেয়ে ভয়ানক প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে—সেনারা যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে কী হবে? শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে আটকে পড়া বাহিনীর জন্য চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো কঠিন, আহতদের সরানো কঠিন, নতুন সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া কঠিন, এমনকি আবহাওয়া বা প্রযুক্তিগত সমস্যা হলেও তা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য শুধু শক্তি নয়, ধারাবাহিক যোগান ও সমন্বয় লাগে; আর ইরানের মতো জটিল পরিবেশে সেই সমন্বয় সবসময় নিশ্চিত করা যায় না।
চতুর্থ এবং অনেকের চোখ এড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকি হলো ইউরেনিয়াম নিজেই। কারণ এখানে শুধু “একটি বস্তু” দখল করার প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হলো এমন একটি পারমাণবিক উপাদান সামলানো, যা ভুলভাবে পরিচালিত হলে রাসায়নিক ও বিকিরণ—দুই ধরনের বিপদই তৈরি করতে পারে। এপি জানিয়েছে, এই সমৃদ্ধ উপাদান সাধারণত ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড বা ইউএফ৬ গ্যাস আকারে ধাতব সিলিন্ডারে রাখা হয়। কনটেইনারগুলো মজবুত হলেও সেগুলো যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরে আর্দ্রতা ঢুকে যায়, তাহলে বিষাক্ত ফ্লোরিন-জাতীয় রাসায়নিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা ত্বক, চোখ ও ফুসফুসের জন্য ভয়ংকর। এই কারণেই ভেতরে যাওয়া সদস্যদের বিশেষ সুরক্ষা-পোশাক লাগতে পারে।
শুধু তাই নয়, এই কনটেইনারগুলোকে কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো হবে, সেটিও বড় সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কনটেইনারগুলোর মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব না রাখা হলে তাত্ত্বিকভাবে বিপজ্জনক বিকিরণ পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। ফলে “উদ্ধার” মানে এখানে ট্রাকে তুলে নেওয়া নয়; বরং কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে, বিশেষ প্যাকেজিং, সুরক্ষিত পরিবহন এবং বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে অপসারণ। যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে এমন অপারেশন চালানো বাস্তবে এক দুঃস্বপ্ন।
এরপর আসে আরেকটি প্রশ্ন: এই উপাদান সরিয়ে নেওয়া হবে, নাকি ঘটনাস্থলেই নিষ্ক্রিয় করা হবে? তাত্ত্বিকভাবে দুটি পথই আলোচনায় থাকতে পারে। কিন্তু দুটির কোনোটি-ই সহজ নয়। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই ইউরেনিয়াম “ডাউনব্লেন্ড” করে কম সমৃদ্ধ পর্যায়ে নামিয়ে আনা একটি দীর্ঘ, জটিল এবং যন্ত্রপাতি-নির্ভর প্রক্রিয়া। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামোর মধ্যে সেটি চালানো বাস্তবে খুবই কঠিন। অন্যদিকে দ্রুত সরিয়ে নিতে গেলেও নিরাপদ বিমান, বিশেষ কন্টেইনমেন্ট, লোডিং সিস্টেম এবং সুরক্ষিত আকাশপথ দরকার হবে। তার ওপর পুরো অপারেশন চলবে শত্রু রাষ্ট্রের ভেতরে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মনে রাখা দরকার: ৪৪০.৯ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো সাধারণ কাঁচামাল নয়। রয়টার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, এটিকে যদি আরও সমৃদ্ধ করা যায়, তাহলে IAEA-র মানদণ্ডে তা ১০টি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক উপাদানের সমতুল্য হতে পারে। এ কারণেই এই উপাদান নিয়ে উদ্বেগ এত বেশি। কিন্তু একই সঙ্গে এই উপাদানকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাটিও এত ভয়ংকর—কারণ, এর গুরুত্ব যত বেশি, সেটিকে ঘিরে ঝুঁকিও তত বেশি।
সব মিলিয়ে এই পরিকল্পনার রাজনৈতিক দামও কম নয়। একটি বড় মাপের মার্কিন স্থল-অভিযান মানে শুধু সামরিক ঝুঁকি নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও। এতে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে, আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে, তেলের বাজার অস্থির হতে পারে, এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এমন এক সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে যেখান থেকে বের হওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও দ্রুত বেরিয়ে আসার চাপ বাড়ছিল। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত কেবল সামরিক নয়, দেশীয় রাজনীতির দিক থেকেও বিশাল ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
এই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানকেই তুলনামূলক নিরাপদ পথ হিসেবে দেখছেন। এপির প্রতিবেদনে পারমাণবিক উপাদান অপসারণে কাজ করা সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যদি কোনো সমঝোতার মাধ্যমে ইরান নিজেই উপাদান হস্তান্তর করে, তাহলে তা সামরিক জোরপ্রয়োগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ। এমন নজির আগেও আছে—কাজাখস্তান থেকে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সরানোর ‘Project Sapphire’-এর মতো মিশন শান্তিপূর্ণ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে নয়।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি খুব সরল: ইরানের ইউরেনিয়াম দখল করা কি সম্ভব? সম্ভব—তত্ত্বে। কিন্তু বাস্তবে তা হবে ভয়াবহ ব্যয়বহুল, দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং রক্তাক্ত এক অপারেশন, যেখানে গোয়েন্দা ভুল, টানেল-যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা, রাসায়নিক বিপদ, পাল্টা হামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে বিস্ফোরিত হতে পারে। তাই কাগজে-কলমে এটি যতই “কৌশলগত বিকল্প” মনে হোক, বাস্তবে অনেকের কাছেই এটি এমন এক সামরিক পদক্ষেপ, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও বেশি অস্থির করে তুলতে পারে।

