রাশিয়া-ন্যাটো সম্পর্কের টানাপোড়েন আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবার পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধে আরও কড়া অভিযোগ তুলেছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। তার দাবি, ন্যাটো এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছে না; বরং আগামী কয়েক বছরে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর মতো বাস্তব প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এই অভিযোগ তিনি তুলেছেন ন্যাটোর বাড়তে থাকা সামরিক ব্যয়, একের পর এক মহড়া এবং রাশিয়াকে ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার প্রেক্ষাপটে। তাসে প্রকাশিত তার বক্তব্যে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন পরিসংখ্যানই ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অভিপ্রায় সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাখারোভার বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যাটোর ২০২৫ সালের কার্যক্রম প্রতিবেদন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিবেদনে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে, যা থেকে বোঝা যায় পশ্চিমা জোটটি শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করছে না, বরং একটি বড় আকারের সম্ভাব্য সংঘাতের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেছেন, ন্যাটোর সম্ভাব্য সামরিক ব্যয় ২০২৫ সালে প্রায় ১.৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তার দাবি, ৩২টি সদস্য দেশের সম্মিলিত ব্যয় বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ। এমন অবস্থায় রাশিয়াকেই উল্টো প্রধান হুমকি হিসেবে দেখানো—এটিকে তিনি রাজনৈতিকভাবে অসংগত এবং কৌশলগতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। NATO-র বার্ষিক প্রতিবেদন এবং Reuters-এর কভারেজ দেখায়, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাস্তব অর্থে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, এবং জোটের ৩২টি দেশই পুরোনো ২ শতাংশ জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ বা অতিক্রম করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পুরো জোটের প্রতিরক্ষা ব্যয় দাঁড়ায় জিডিপির ২.৭৭ শতাংশে, আর এই ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের অংশ। অর্থাৎ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সত্যিই ঘটেছে, যদিও জাখারোভা সেটিকে যে ভাষায় “রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রস্তুতি” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, সেটি মূলত রুশ পক্ষের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।
রাশিয়ার অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে আছে সামরিক মহড়া। জাখারোভা দাবি করেছেন, গত বছর ন্যাটোর ব্যানারে ১২০টির বেশি সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর পাশাপাশি সদস্য রাষ্ট্রগুলো আলাদাভাবে ৭০০টিরও বেশি প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন কার্যক্রম চালিয়েছে। তার মতে, শুধু সংখ্যাই নয়, এসব মহড়ার প্রকৃতিও উদ্বেগের। কারণ তিনি অভিযোগ করেন, এগুলোতে কেবল প্রতিরক্ষামূলক কৌশল নয়, আক্রমণাত্মক ধরনের অপারেশনও অনুশীলন করা হচ্ছে। আর অংশীদার দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়তে থাকায় এই সামরিক প্রস্তুতির পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এই অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে—ন্যাটো নিজেকে প্রতিরক্ষামূলক জোট বললেও বাস্তবে তার সম্প্রসারণ, সামরিক অবকাঠামো, সীমান্তঘেঁষা মহড়া এবং কৌশলগত অবস্থান রাশিয়ার জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২৪ সালেও Steadfast Defender মহড়াকে কেন্দ্র করে মস্কো একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। সে সময়ও রুশ পক্ষ বলেছিল, পশ্চিমা জোটটির মহড়া কেবল প্রতীকী নয়; বরং সম্ভাব্য বড় সংঘাতের অনুশীলন। অর্থাৎ, এবারের বক্তব্য হঠাৎ করে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের রুশ নিরাপত্তা-আখ্যানেরই ধারাবাহিকতা।
তবে NATO নিজেদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। জোটের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের প্রকাশিত অংশে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, NATO-র deterrence and defense posture বা প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা ভঙ্গি “defensive, proportionate and fully in line with Allies’ international commitments”—অর্থাৎ এটি প্রতিরক্ষামূলক, পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত। NATO-র ভাষ্যে ব্যয় বৃদ্ধি ও সামরিক প্রস্তুতির কারণ হলো একটি “বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠা বিশ্ব” এবং বিশেষ করে ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তা পরিবেশের অবনতি।
এখানে বড় প্রশ্নটি হলো: NATO কেন রাশিয়াকে এত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে? NATO-র বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক নথি ও সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনের সারাংশে রাশিয়াকে “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি হুমকি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জোটটির মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইউরোপে সামরিক চাপ, আকাশসীমা লঙ্ঘন, সাইবার কার্যক্রম, অবকাঠামো ঝুঁকি এবং বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে রাশিয়া ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। জাখারোভা এই অবস্থানকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, এসব অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষেই NATO কোনো বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ বা নিরপেক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
এই টানাপোড়েনের আরেকটি দিক হলো ভাষার যুদ্ধ। NATO বলে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করছে। রাশিয়া বলে, এটি নিরাপত্তা জোরদার করা নয়, বরং সংঘাতের মঞ্চ প্রস্তুত করা। NATO বলে, তারা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে কারণ নিরাপত্তা হুমকি বেড়েছে। মস্কো বলে, পশ্চিমা জোটই আসলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, তারপর সেই উত্তেজনাকে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সামরিক প্রস্তুতির যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। এই দুই বয়ানের সংঘর্ষ এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে এক পক্ষের “প্রতিরক্ষা” অন্য পক্ষের চোখে “আক্রমণের প্রস্তুতি” হয়ে উঠছে।
আর এখানেই ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিবেশের ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে। কারণ সবকিছু সরাসরি যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় যুদ্ধের আগে শুরু হয় পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামরিক ব্যয়ের দ্রুত উল্লম্ফন, মহড়া বাড়ানো, সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা, আকাশে নজরদারি বাড়ানো, সাইবার অভিযোগ, নাশকতার আশঙ্কা, এবং কূটনৈতিক ভাষার ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠা। আজ NATO ও রাশিয়ার সম্পর্ক ঠিক সেই সংকটপূর্ণ পর্যায়েই দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের পদক্ষেপকে প্রতিরক্ষামূলক বলছে, কিন্তু প্রতিপক্ষ সেটিকেই আগ্রাসী আচরণ হিসেবে পড়ছে।
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ১.৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো সম্ভাব্য সামরিক ব্যয়, ১২০টির বেশি জোটীয় মহড়া, ৭০০টিরও বেশি পৃথক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং রাশিয়াকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা—সব মিলিয়ে একটি চিন্তার কারণ। মস্কোর আশঙ্কা হলো, এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত একটি এমন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, যেখানে “প্রস্তুতি” আর “সংঘাত”-এর মধ্যে ব্যবধান খুব দ্রুত কমে আসবে। বিশেষ করে যদি কোনো সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে ভুল হিসাব, ভুল সিগন্যাল, কিংবা অনিচ্ছাকৃত সামরিক ঘটনা ঘটে, তাহলে সেটি আরও বড় উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
অন্যদিকে NATO-র সমর্থকেরা বলবেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপই পশ্চিমা দেশগুলোকে আরও সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। তাদের যুক্তি হলো, নিরাপত্তা হুমকি বাস্তব বলেই ব্যয় বেড়েছে, আর সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে। NATO-র সাম্প্রতিক সরকারি ভাষ্যও এই দিকেই ইঙ্গিত করে—রাশিয়াকে জোটটির নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে NATO জোর দিচ্ছে যে তাদের সামরিক ভঙ্গি প্রতিরক্ষামূলক।
ফলে বিষয়টি শুধু “কে ঠিক, কে ভুল”—এই প্রশ্নে আটকে নেই। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এই পাল্টাপাল্টি নিরাপত্তা-আখ্যান ইউরোপ ও বিশ্ব রাজনীতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় যত বাড়ে, সন্দেহও তত বাড়ে। সন্দেহ যত বাড়ে, সামরিক প্রস্তুতিও তত বাড়ে। আর এই চক্র যদি ভাঙা না যায়, তাহলে উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ছোট একটি ঘটনাও অপ্রত্যাশিত বড় সংকট ডেকে আনবে।
সবশেষে বলা যায়, মারিয়া জাখারোভার অভিযোগ নিছক আরেকটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি রাশিয়ার বৃহত্তর অবস্থানেরই প্রতিফলন। NATO-র ব্যয়, মহড়া এবং ভাষ্যকে তারা সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। আবার NATO বলছে, তার সব প্রস্তুতি নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। কিন্তু এই দুই অবস্থানের মাঝখানে যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা হলো—ন্যাটো-রাশিয়া সম্পর্ক আরও বেশি অবিশ্বাস, আরও বেশি সামরিকীকরণ এবং আরও বেশি অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে। আর সেই কারণেই বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এই বক্তব্য নতুন করে NATO-রাশিয়া উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

