ওয়াশিংটনে এখন রাজনীতি, যুদ্ধ আর অর্থনীতির তিনমুখী চাপ একসঙ্গে এসে যেন একটি বড় অস্থিরতার ছবি তৈরি করেছে। একদিকে ইরানকে ঘিরে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘায়িত সংঘাত, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের, আর একই সময়ে রাস্তায় রাস্তায় ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন এমন এক সময় পার করছে, যাকে নিছক “কঠিন সময়” বললে কম বলা হয়। সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখাচ্ছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক চাপও তত বাড়ছে।
রয়টার্স/ইপসোস জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন নেমে এসেছে ৩৬ শতাংশে। একই সময়ে যুদ্ধ নিয়েও জনসমর্থন দুর্বল হয়েছে। রয়টার্স/ইপসোসের আরেক জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ আমেরিকান চান যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসুক, এমনকি প্রশাসনের সব লক্ষ্য পূরণ না হলেও। আর ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছেন। অর্থাৎ, হোয়াইট হাউস যদি ভেবে থাকে যুদ্ধক্ষেত্রের আক্রমণাত্মক অবস্থান দেশীয় রাজনীতিতে ট্রাম্পকে শক্তিশালী করবে, তাহলে জনমতের বর্তমান প্রবণতা সেই হিসাবকে খুব একটা সমর্থন করছে না।
এই জনমতবদলের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক চাপ। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম ৪ ডলার প্রতি গ্যালনের ওপরে উঠে গেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং জ্বালানি সরবরাহে চাপ—সব মিলিয়ে জ্বালানি ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো গাড়িনির্ভর সমাজে এই চাপ শুধু পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি খাবার, পরিবহন, ডেলিভারি, নিত্যপণ্যের দাম এবং সামগ্রিক ভোক্তা আস্থায় আঘাত হানে।
অর্থনীতির প্রশ্নে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতাও তাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অর্থনীতি সামলানোর পক্ষে সমর্থন মাত্র ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। যুদ্ধের খরচ, জ্বালানির দামের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা—এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে ভোটাররা “শক্তিশালী নেতৃত্ব”র ভাষণের চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন ব্যয়ের হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয়, তবে এই অর্থনৈতিক অস্বস্তি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
রাস্তায় নামা মানুষের ভাষাতেও সেই ক্ষোভ স্পষ্ট। মার্চের শেষে “No Kings” ব্যানারে ৫০টি অঙ্গরাজ্যজুড়ে ৩,২০০-এর বেশি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বড় শহরের পাশাপাশি ছোট শহর ও কমিউনিটিতেও এই কর্মসূচির বিস্তার ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্দোলনের বার্তাটি মোটামুটি পরিষ্কার—ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, নির্বাহী আচরণ, অভিবাসন অভিযান, এবং ইরান যুদ্ধ—সবকিছুর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এখন আরও বেশি দৃশ্যমান। এই বিক্ষোভকে কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী রাস্তাঘাটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ট্রাম্পবিরোধী জনসমাবেশ এখন আবার সংগঠিত, বিস্তৃত এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের জন্য আরও অস্বস্তিকর বিষয় হলো—এই জনঅসন্তোষ এখন সরাসরি মিডটার্ম রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি হবে হোয়াইট হাউসের জন্য এক ধরনের জনরায়। ইতিহাস বলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রায়ই ধাক্কা খায়। ট্রাম্প নিজেও জানুয়ারিতে হাউস রিপাবলিকানদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তারা যদি এই নির্বাচন হেরে যায়, ডেমোক্র্যাটরা তাকে অভিশংসনের পথ খুঁজে নেবে। এই মন্তব্যটিই প্রমাণ করে, হোয়াইট হাউস খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে—মিডটার্ম কেবল আসনসংখ্যার লড়াই নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও বয়ে আনছে।
অভিশংসনের প্রশ্নটি তাই এখনো পুরোপুরি কাল্পনিক নয়, যদিও সেটিকে অবশ্যম্ভাবী বলাও ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোয় হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের একক ক্ষমতা আছে ফেডারেল কর্মকর্তাকে অভিশংসনের, আর সিনেট বিচার পরিচালনা করে; দোষী সাব্যস্ত করতে সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগে। অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পায়, তবুও ট্রাম্পকে পদচ্যুত করা সহজ হবে না। তবে তদন্ত, শুনানি, নথি তলব, রাজনৈতিক চাপে ফেলা এবং প্রশাসনকে অবরুদ্ধ করে রাখা—এসবের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হতে পারে। সেখানেই ট্রাম্পের বাস্তব ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
আরেকটি বড় চাপ আসছে যুদ্ধের সম্ভাব্য ব্যয় থেকে। মার্চের মাঝামাঝি রয়টার্স জানায়, পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের কাছে ইরান যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। যুদ্ধের মাত্র প্রথম কয়েক দিনেই বিপুল অর্থব্যয়ের আলোচনা শুরু হওয়ায় কংগ্রেসে এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস আগে থেকেই বড় প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করেছে; তার পরেও যদি নতুন বিশাল তহবিলের দাবি আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই অর্থ কে দেবে, কত দিন দেবে, আর যুদ্ধের শেষ কোথায়? যুদ্ধের ময়দানে দৃশ্যমান “অগ্রগতি” থাকলেও, ভেতরের এই আর্থিক প্রশ্ন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরও বড় রাজনৈতিক ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে ট্রাম্পের সমস্যা শুধু বিরোধী দলের সঙ্গে নয়, নিজের শিবিরের ভেতরেও। রিপাবলিকান ভোটারদের একটি অংশ এখনো শক্ত অবস্থানের পক্ষে থাকলেও, দীর্ঘ যুদ্ধ, বেড়ে যাওয়া জ্বালানি ব্যয় এবং সম্ভাব্য স্থল-অভিযানের আশঙ্কা MAGA ঘাঁটির মধ্যেও দ্বিধা তৈরি করছে বলে বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। Washington Post-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর পক্ষে সমর্থন খুবই কম। অর্থাৎ, যুদ্ধ যদি বিমান হামলা থেকে সরে গিয়ে আরও গভীর সামরিক সম্পৃক্ততায় যায়, তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক মূল ভিত্তিও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের সামনে সুযোগও আছে, আবার ঝুঁকিও আছে। সুযোগ হলো—অর্থনীতি, যুদ্ধ, এবং শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে তারা একটি বিস্তৃত ট্রাম্পবিরোধী জোট গড়ে তুলতে পারে। ঝুঁকি হলো—অভিশংসনের প্রশ্ন বেশি সামনে আনলে সেটি উল্টো রিপাবলিকান ভোটারদের আরও উজ্জীবিত করতে পারে। তাই বাস্তবে ডেমোক্র্যাটরা সম্ভবত “আগে নির্বাচন, পরে অভিশংসন” কৌশলেই হাঁটবে। তারা আগে কংগ্রেসে শক্তি ফিরে পেতে চাইবে, তারপর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তদন্ত, শুনানি ও রাজনৈতিক চাপের পথ নেবে। এই বাস্তবতা ট্রাম্পকে জানুয়ারি থেকেই এতটা সতর্ক করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক রাজনৈতিক করিডরে হাঁটছেন, যেখানে দুই পাশে সমান ঝুঁকি। একদিকে যদি যুদ্ধ চালিয়ে যান, তবে ব্যয়, হতাহতের আশঙ্কা, জ্বালানির দাম ও জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে যদি দ্রুত সরে আসেন, তবে বিরোধীরা বলবে—তিনি স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি ব্যয়বহুল সংঘাতে টেনে নিয়েছিলেন। ফলে তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি যুদ্ধকে এমনভাবে শেষ করতে পারবেন, যাতে সেটিকে অন্তত রাজনৈতিক ভাষায় “বিজয়” হিসেবে বিক্রি করা যায়? নাকি নভেম্বরের ভোটের আগেই এই সংঘাত, দ্রব্যমূল্য এবং রাস্তায় বিক্ষোভ—সব একসঙ্গে মিলে তার প্রশাসনকে গভীর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেবে?
এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে একটাই কথা বলা যায়: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষ, জ্বালানির বাড়তি বোঝা, এবং সংগঠিত বিক্ষোভ—সব মিলে ২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচনকে শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন রাখছে না। এটি ধীরে ধীরে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। আর যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে যায়, তাহলে অভিশংসন তাৎক্ষণিক বাস্তবতা না হলেও, ওয়াশিংটনে ট্রাম্পকে ঘিরে তদন্ত, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক লড়াইয়ের নতুন অধ্যায় খুলে যেতে পারে।

