যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ মূলত তার গত কয়েক দিনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি। হোয়াইট হাউস থেকে বুধবার সন্ধ্যায় প্রাইমটাইমে দেওয়া এই ২০ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের “মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলো” এক মাসের যুদ্ধের পর “সম্পন্ন হওয়ার পথে” এবং এটি দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে আগের মতোই হুমকি ছিল, যার মধ্যে দেশটিকে “বোমা মেরে পাথর যুগে ফেরত পাঠানো”–এর অঙ্গীকারের পুনরাবৃত্তিও অন্তর্ভুক্ত। তবে যুদ্ধের উদ্দেশ্য বা সম্ভাব্য বিজয়ের মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিবরণ তিনি দেননি। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের ভাষণ প্রধানত জনমতকে সামলানোর চেষ্টা, যাতে ভোটাররা এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে না দেখে।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে আমেরিকানদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ বিভিন্ন জরিপ দেখাচ্ছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে ভোটারদের সিংহভাগ সমর্থন দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের চাপ বেড়ে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট বলেন, এই যুদ্ধকে তারা যেন ভবিষ্যতের একটি “বিনিয়োগ” হিসেবে দেখেন। ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, গত শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র যে সমস্ত সংঘাতে দীর্ঘ সময় জড়িত হয়েছে, সেই তুলনায় বর্তমান যুদ্ধ তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র।
ইসরায়েল এখনও ইরানকে আক্রমণ চালাচ্ছে, এবং পাল্টা আক্রমণেও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ট্রাম্পের দুই-তিন সপ্তাহের সময়সীমার সঙ্গে কতটা একমত, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে, হোয়াইট হাউসের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবের সঠিক স্থিতি ভাষণে উল্লেখ হয়নি। এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি ও কৌশলগত প্রাপ্তি বোঝা।
হরমুজ প্রণালীর পুনরায় খোলা এবং ট্যাংকার চলাচল, যা বিশ্বের ব্যস্ততম তেল পরিবহন পথগুলোর একটি, এ মুহূর্তে সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু। ট্রাম্প একদিকে ইরানকে চাপ দিচ্ছেন প্রণালি খোলার জন্য, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, “যারা পারবেন, তারা নেতৃত্ব দিন এবং প্রণালি রক্ষা করুন।” তেলের দামে উদ্বিগ্ন মার্কিন নাগরিকদের জন্য এই বার্তা খুব বেশি আশ্বস্তকর নয়।
স্থলবাহিনী নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হাজার হাজার মেরিন ও প্যারাট্রুপার প্রেরিত হলেও, তারা সেখানে ঠিক কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা পরিষ্কার নয়। ভাষণে ট্রাম্প এই বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলেননি। ফলে যুদ্ধের বিজয় বা সেনাদের কার্যক্রম সম্পর্কিত বোঝাপড়া সীমিতই থেকে গেছে।
এই ভাষণ দেওয়ার সময় মার্কিন গ্যাসের গড় দাম চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো চার ডলার ছাড়িয়েছে, এবং ট্রাম্পের অনুমোদন রেটিং দ্রুত নিম্নমুখী। মধ্যবর্তী নির্বাচনও কয়েক মাস দূরে, যা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যেন এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন—কিন্তু সেই পথ এখনও অস্পষ্ট।
পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের জাতীয় ভাষণ জনমতকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সামরিক অভিযানের পুনর্ব্যাখ্যার সমন্বয়। তবে যুদ্ধের লক্ষ্য, প্রণালীর পুনরায় খোলা এবং স্থলবাহিনীর দায়িত্ব—এসব স্পষ্টতার অভাবে, দর্শকরা এখনও ট্রাম্প প্রশাসনের আসল কৌশল ও সম্ভাব্য ফলাফল বোঝার দিক থেকে সীমিত তথ্যই পেয়েছেন।

