মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়াতেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে, আর বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়েছে। এই টানটান পরিস্থিতির মাঝেই চীন নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, বেইজিং কি সত্যিই যুদ্ধ থামাতে নামছে, নাকি এর পেছনে আছে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান আর ‘দুই থেকে তিন সপ্তাহের’ মধ্যে শেষ হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার সেই সম্ভাব্য সময়সীমা শোনালেও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ থামার আগেই বিশ্ববাজারে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে। সেই শূন্যতায় এখন কূটনৈতিকভাবে জায়গা করে নিতে চাইছে চীন।
এই যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান নতুন কিছু নয়, কিন্তু নতুন দিকটি হলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভাব এবং সেই প্রক্রিয়ায় চীনের অপ্রত্যাশিতভাবে যোগ দেওয়া। বেইজিং ও ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা যুদ্ধ থামাতে একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা সামনে এনেছেন। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে আছে দুইটি জরুরি বিষয়—যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার সবার জন্য খুলে দেওয়া। কারণ হরমুজ প্রণালির অবস্থা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়া দিতে পারে।
এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল, এবং মনে করা হচ্ছে, এই যুদ্ধের মধ্যস্থতার প্রশ্নে তারা ট্রাম্পের সম্মতি আদায় করতে পেরেছে। কিন্তু চীনের অংশগ্রহণ বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ এটি এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন আগামী মাসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বৈঠক হওয়ার কথা। ফলে অনেকের কাছেই চীনের এই কূটনৈতিক সক্রিয়তা নিছক শান্তি প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি হয়তো আসন্ন বড় কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এবং লানঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আফগানিস্তান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ঝু ইয়ংবিয়াও মনে করেন, এই সংকটে চীনের সমর্থন “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”। তাঁর ভাষায়, নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক—সব দিক থেকেই বেইজিং পাকিস্তানকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে, যাতে ইসলামাবাদ আরও জোরালো ভূমিকা নিতে পারে। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, চীন নিজে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি করতে চাইছে।
তবে বেইজিংয়ের এই সক্রিয়তা আরও বেশি চোখে লাগে একটি কারণে—এতদিন তারা এই যুদ্ধ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ নীরব ছিল। শুরুতে পাশ কাটিয়ে থাকা চীন হঠাৎ এখন কেন এত আগ্রহ দেখাচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু কূটনীতির দিকে তাকালে হবে না; দেখতে হবে চীনের অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অবস্থানকেও।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফরের পরই শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হয়। সেই সফরে তিনি এই যুদ্ধ থামাতে চীনের সমর্থন চান। এরপর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশই “শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন করে প্রচেষ্টা” চালাচ্ছে। যৌথ বিবৃতিতে তারা স্পষ্টভাবে বলে, এই যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র কার্যকর পথ হলো সংলাপ ও কূটনীতি। একইসঙ্গে তারা অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালিসহ অন্যান্য সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানায়। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, চীন চায় নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে, যে যুদ্ধের বদলে আলোচনা ও স্থিতিশীলতার ভাষা ব্যবহার করে।
কিন্তু শুধুই কি শান্তির স্বার্থে এই অবস্থান? সম্ভবত না। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রুড অয়েল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের কাছে আগামী কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে তারা জ্বালানি-সংকটে ডুবে যাচ্ছে না। কিন্তু চীনের বড় ভয় অন্য জায়গায়—অস্থিতিশীলতা। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনদর্শনে স্থিতিশীলতা একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভ্যন্তরীণভাবে অর্থনীতি দুর্বল, চাহিদা চাপের মুখে, আর সেই অবস্থায় বিশ্বজুড়ে পণ্য বিক্রির ওপরই বড়ভাবে নির্ভর করে চীনের অর্থনীতি। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য যদি ধাক্কা খায়, তার বড় চাপ গিয়ে পড়বে চীনের শিল্পকারখানা, উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের ওপর।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির চীন প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান ম্যাট পটিঞ্জারও একই আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানি সংকটের কারণে যদি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি কমে যায়, তাহলে চীনের কারখানা ও রপ্তানিকারকদের জন্য সেটা খুবই কঠিন সময় ডেকে আনবে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এ কারণেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইরানকে যুদ্ধ থামানোর উপায় খুঁজতে বলার মধ্যে কিছুটা আন্তরিকতা ছিল। কারণ যদি পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটে রূপ নেয়, তাহলে তার ধাক্কা বেইজিং সরাসরি অনুভব করবে।
তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু পাম্পে গিয়ে থামে না। আধুনিক অর্থনীতির অসংখ্য খাতে তা সরাসরি আঘাত হানে। খেলনা বা গেম তৈরির প্লাস্টিক, সিন্থেটিক কাপড়ের কাঁচামাল, ফোন, ইলেকট্রিক গাড়ি, এমনকি সেমিকন্ডাক্টরের অসংখ্য যন্ত্রাংশ—সবকিছুই কমবেশি জ্বালানি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তার অভিঘাত চীনের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে আরও স্পষ্টভাবে পড়বে। এই বাস্তবতা বেইজিংকে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগে ঠেলে দিয়েছে বলেই মনে হয়।
চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্য এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের পর অনেক চীনা ব্যবসায়ী নতুন বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। সেই প্রক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ক্রমে চীনা পণ্যের জন্য বড় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। গত বছর বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি দ্রুতগতিতে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এ তথ্য একাই বোঝায়, এই অঞ্চলকে স্থিতিশীল রাখার মধ্যে চীনের সরাসরি বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত।
শুধু পণ্য রপ্তানি নয়, বিনিয়োগের দিক থেকেও মধ্যপ্রাচ্যে চীনের উপস্থিতি এখন অনেক গভীর। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার হিসেবে অঞ্চলটি দ্রুত বেড়ে উঠছে। পাশাপাশি সুপেয় পানির তীব্র সংকটে থাকা দেশগুলোতে সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালাইনেশন প্রকল্পেও চীন বড় বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাকে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না বিভিন্ন প্রকল্প চালাচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুধু তেলের পথ নয়, চীনের ব্যবসার পথও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও গভীর। তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে কয়েক দশকের অংশীদারত্ব রয়েছে। বর্তমানে চীন ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার, এবং ইরানের উৎপাদিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনে থাকে চীন। ফলে ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা কিংবা তেলের রুটে অচলাবস্থা বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগত চিন্তার বিষয় হওয়ারই কথা। শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাই একদিকে কূটনৈতিক ভূমিকা, অন্যদিকে স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা।
চীন অবশ্য এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৩ সালে তারা সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেছিল। এই দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রক্সি যুদ্ধের দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছিল। এর আগে ২০১৬ সালে সৌদি আরব এক প্রখ্যাত শিয়া ধর্মীয় নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ইরানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা হয়, এবং দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সেই দীর্ঘ উত্তেজনার পর আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হওয়া চীনের জন্য ছিল একটি বড় সাফল্য।
তারও এক বছর পরে বেইজিং ফাতাহ ও হামাসসহ ফিলিস্তিনের ১৪টি উপদলকে আলোচনার টেবিলে আনে। সেই প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে পশ্চিম তীর ও গাজার জন্য একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের ঘোষণা আসে। যদিও সেটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে সদিচ্ছার প্রকাশ বেশি ছিল, তবু এতে বোঝা যায়—চীন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেকে কেবল ব্যবসায়ী শক্তি হিসেবে নয়, কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
তবে এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: চীন কি সত্যিই সফল মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়। কারণ চীনের কূটনীতি ও প্রভাবের ধরন যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। তাদের অংশীদারত্বে সাধারণত নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকে না। বেইজিং মূলত অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর প্রভাব তৈরি করে। অর্থাৎ তারা বন্দুকের শক্তিতে নয়, টেবিলের আলোচনায় জায়গা নিতে চায়। কিন্তু সব সংকট কি শুধু অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে সামাল দেওয়া যায়? এখানেই চীনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।
ঝু ইয়ংবিয়াও বলেছেন, বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে চীন অত্যন্ত সতর্ক। তাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই নীতির ক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এমনকি চীনের ভেতরেও একটি শক্তিশালী জনমত রয়েছে যে, দেশটির বেপরোয়াভাবে কোনো যুদ্ধে জড়ানো উচিত নয়। অর্থাৎ চীন শান্তি চায়, কিন্তু সেই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেরা বড় ঝুঁকি নিতে খুব বেশি আগ্রহী নয়।
সামরিক বাস্তবতাও বেইজিংয়ের বিপক্ষে। পারস্য উপসাগরীয় প্রায় প্রতিটি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অন্যদিকে চীনের নিকটতম ঘাঁটি পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে, যা ২০১৭ সালে স্থাপিত হয়। সেটিও মূলত অ্যান্টিপাইরেসি অভিযানের একটি লজিস্টিকস হাব, শক্তিশালী আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটি নয়। ফলে চীন চাইলেও এই অঞ্চলে সেই ধরনের নিরাপত্তা-ভিত্তিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, যেটা অনেক সময় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হয়।
এমনকি ২০২৫ সালের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে চীন কার্যত সাইডলাইনে ছিল এবং খুব সীমিত সহায়তা দিয়েছিল। সেটিও দেখিয়েছে, অংশীদার হিসেবে চীনের প্রভাবের একটি সীমানা আছে। বর্তমান শান্তি পরিকল্পনার বিষয়েও এখনো যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি। ফলে বেইজিংয়ের উদ্যোগ প্রচারমূলক সাফল্য পেলেও বাস্তব ফল দেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটাও সত্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শি জিনপিং নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
চীনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বড় প্রশ্ন আছে। নিজেদের বাস্তববাদী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ রয়েছে। তার ওপর হংকংয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখলের হুমকি, এবং মানবাধিকার বিষয়ে ধারাবাহিক নীরবতা—এসবই চীনের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে। ফলে “নিয়মনীতিভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা”-র মুখপাত্র হিসেবে শি জিনপিংকে সবাই যে সমানভাবে বিশ্বাস করবে, তা নয়।
তবু পুরো ছবিটা একরঙা নয়। চীন যে শুধুই কাগুজে শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তার কিছুটা প্রভাব আছে—সেটা আগের ঘটনাগুলোতেই বোঝা গেছে। সৌদি-ইরান সমঝোতা হোক বা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোকে একই টেবিলে আনার চেষ্টা—বেইজিং অন্তত দেখিয়েছে, তারা দরজা খুলতে পারে। কিন্তু দরজা খোলা আর যুদ্ধ থামানো এক জিনিস নয়। কারণ বর্তমান সংকট অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি বিস্ফোরক, এবং এতে জড়িয়ে আছে সরাসরি সামরিক, জ্বালানি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চীনের এই মধ্যস্থতার উদ্যোগের মধ্যে যেমন কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, তেমনি আছে স্পষ্ট স্বার্থের অঙ্ক। বেইজিং যুদ্ধ থামাতে চাইছে—কারণ যুদ্ধ থামলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা, বিনিয়োগ, জ্বালানি প্রবাহ এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সবই ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু সফল হতে গেলে শুধু শান্তির ভাষণ দিলেই হবে না; দরকার হবে গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা, প্রভাব এবং সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সাড়া। এখন পর্যন্ত সেই জায়গায় চীন নিশ্চিত সাফল্যের অবস্থানে নেই।
শেষ পর্যন্ত, ইরান যুদ্ধে চীনের ভূমিকা হয়তো বিশ্বের সামনে একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—বেইজিং আর শুধু দূর থেকে পর্যবেক্ষক থাকতে চায় না। তারা এখন বৈশ্বিক সংকটে উপস্থিতি দেখাতে চায়, বিশেষ করে সেইসব অঞ্চলে, যেখানে তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সত্যিকারের সফলতা নির্ভর করবে একটি কঠিন বাস্তবতার ওপর: চীন কি শুধু প্রস্তাব দিতে পারবে, নাকি বাস্তব পরিবর্তনও ঘটাতে পারবে? আপাতত সেই উত্তর এখনো খোলা রয়ে গেছে।

