ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকার শর্ত অনুযায়ী কোনো সমঝোতা না হলে ইরানকে এমনভাবে আঘাত করা হবে যে দেশটি “প্রস্তর যুগে” ফিরে যাবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনায়, তিনি শুধু সামরিক চাপের কথা বলেননি; ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই ধরনের ভাষা প্রথম শুনলে অনেকের কাছে তা রাজনৈতিক দম্ভ বা যুদ্ধকালীন উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে “প্রস্তর যুগে ফেরানো” কথাটির অর্থ অনেক বেশি ভয়াবহ। এর মানে শুধু সেনাঘাঁটি আঘাত করা নয়; বরং এমন অবকাঠামো ধ্বংস করা, যার ওপর একটি দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দাঁড়িয়ে থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হলে হাসপাতাল অচল হয়, পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়, এবং একটি গোটা সমাজ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যায়। তাই এই হুমকি মূলত রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার নাগরিকজীবনকেও লক্ষ্য করে।
এ কারণেই ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে কেবল কূটনৈতিক চাপ হিসেবে দেখা কঠিন। এটি এমন এক যুদ্ধদর্শনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার সবচেয়ে দ্রুত উপায় হিসেবে তার আধুনিক জীবনযাত্রার ভিত্তিই ভেঙে ফেলার কথা ভাবা হয়। যুদ্ধ তখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি ঢুকে পড়ে শহরের আলোতে, হাসপাতালের অক্সিজেনে, পানির পাম্পে, ইন্টারনেট লাইনে, এমনকি মানুষের ঘরের ভেতরেও। এই ভাষা তাই সামরিক নয় শুধু, মানবিকও নয়; এটি এক ধরনের ভীতি-রাজনীতি।
“প্রস্তর যুগে ফেরানো” বাক্যটি নতুন কিছু নয়। আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে এ ধরনের ভাষার দীর্ঘ ছায়া আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে জাপানের শহরগুলোতে ভয়াবহ অগ্নিবোমা হামলার সঙ্গে মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল কার্টিস লিমে-র নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। পরে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও “stone age” ধরনের নির্মম বোমাবর্ষণ-ভাষা মার্কিন সামরিক কল্পনায় ঘুরে ফিরে এসেছে। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা দেখায়, কোনো দেশকে “সভ্যতা থেকে ছিটকে ফেলা” শুধু রাগের কথা নয়; এটি সামরিক শক্তি প্রদর্শনের এক পুরোনো মনস্তত্ত্ব।
কোরীয় যুদ্ধের ইতিহাসও একই ধরনের ধ্বংসের স্মৃতি বহন করে। বিভিন্ন লেখালেখি ও রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, ১৯৫০ সালের দিকে উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন বোমাবর্ষণে দেশটির ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং প্রায় ৮০ ভাগ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলো নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও, গবেষণা ও ঐতিহাসিক নথি মোটের ওপর একমত যে উত্তর কোরিয়ার শহর, জনপদ ও অবকাঠামোর ওপর মার্কিন বিমান হামলা ছিল বিপুলমাত্রায় ধ্বংসাত্মক; বহু শহর ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ “প্রস্তর যুগে ফেরানো” শুধু রূপক বাক্য নয়, এর সঙ্গে বাস্তব ধ্বংসের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।
একইভাবে ১৯৭২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যাপক বোমাবর্ষণের নির্দেশ দেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই পর্যায় বহু মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে কৌশলগত বোমাবর্ষণকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুবিধা পেলেও, এই ধরনের হামলা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্মৃতিতে যে ক্ষত তৈরি করে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে।
আরও একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ আসে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর-এর পরের সময় থেকে। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ পরে দাবি করেছিলেন, তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে পাকিস্তান সহযোগিতা না করলে দেশটিকে “প্রস্তর যুগে” ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাটি দেখায়, এ ধরনের ভাষা কেবল যুদ্ধরত শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, চাপ প্রয়োগের বৃহত্তর কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকিকে তাই একক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন এক ঐতিহাসিক ধারার নতুন সংস্করণ, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত করতে চায় না, তাকে অক্ষম, অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং বিচ্ছিন্ন করে ফেলতেও চায়। ভাষণের পর বৈশ্বিক বাজারে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হওয়া—তাও বুঝিয়ে দেয় যে এ ধরনের বক্তব্য শুধু একটি দেশের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানকে ঘিরে এই মুহূর্তের বড় প্রশ্ন আসলে শুধু যুদ্ধ হবে কি হবে না, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো: ২১শ শতকে কি এখনো এমন এক বিশ্বরাজনীতি চালু আছে, যেখানে একটি দেশের জনগণকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ভাষাকে স্বাভাবিক করে দেখা হয়? যখন কোনো রাষ্ট্রনেতা বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো বা জাতীয় জীবনরেখাকে টার্গেট করার কথা বলেন, তখন সেটি শুধু সামরিক বার্তা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সভ্যতার বিরুদ্ধে হুমকি।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের “ইরানকে প্রস্তর যুগে ফেরানো” মন্তব্যটি কেবল উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বাক্য নয়; এটি ইতিহাসের এক ভয়াবহ ধারাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এই ভাষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম রূপ হলো সেই যুদ্ধ, যেখানে মানুষের শরীরের আগে তার জীবনযাপনের ভিত্তি ধ্বংস করা হয়। আর সেই কারণেই এই হুমকি শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

