মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের রদবদলের ঘটনা ঘটেছে। এমন এক সময়, যখন অঞ্চলজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি তুঙ্গে, ঠিক তখনই মার্কিন সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকা সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—যা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মার্কিন সেনাপ্রধান (চিফ অফ স্টাফ) জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, যারা তিনজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
পেন্টাগনের দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানানো হয়, ৪১তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেনারেল জর্জ অবিলম্বে অবসরে যাচ্ছেন। তবে কেন তার নির্ধারিত চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে আসল কারণ কী, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
শুধু জেনারেল জর্জই নন, একই দিনে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাকেও তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডেভিড হডনি এবং আর্মি চ্যাপলেন কোরের প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিন। এই ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলো থেকে অনেকেই মনে করছেন, পেন্টাগনের ভেতরে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পিট হেগসেথ পেন্টাগনে বেশ কিছু কঠোর ও অপ্রচলিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফক্স নিউজের সাবেক এই উপস্থাপক দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলো সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সময়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি চরম পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এলিট ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার সেনা ইতোমধ্যে সেখানে মোতায়েন রয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।
পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বা সংকটকালীন সময়ে সামরিক নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ভবিষ্যৎ কৌশলগত পরিকল্পনা বা অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের ইঙ্গিতও দিতে পারে।
জানা গেছে, জেনারেল র্যান্ডি জর্জের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবেন জেনারেল ক্রিস্টোফার লানিভ। তিনি এর আগে প্রতিরক্ষা সচিব হেগসেথের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও গত বছর জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল সি.কিউ. ব্রাউনসহ নৌ ও বিমানবাহিনীর একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ধারাবাহিক এসব পরিবর্তন পেন্টাগনের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করছে বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল ও নেতৃত্বের ভেতরের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

