ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ শুধু সামরিক ঘাঁটি, কৌশলগত অবকাঠামো বা নিরাপত্তা স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নেই—এমন অভিযোগ এখন আরও জোরালো হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, হামলার প্রভাব গিয়ে পড়ছে সরাসরি দেশটির স্বাস্থ্যখাতের ওপরও। হাসপাতাল, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র, এমনকি ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণের জায়গাও আঘাতের বাইরে থাকছে না।
এই পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রতি প্রকাশ্যে আহ্বান জানান। তার প্রশ্ন ছিল সরাসরি—হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা হলে, সেটি বিশ্বের জন্য কী বার্তা বহন করে? এই প্রশ্নের ভেতরেই আসলে লুকিয়ে আছে বর্তমান সংকটের গভীরতা। কারণ যুদ্ধের সময় চিকিৎসা অবকাঠামো আক্রান্ত হওয়া মানে শুধু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়; এর অর্থ হলো রোগী, চিকিৎসক, জরুরি সেবা, ভ্যাকসিন সরবরাহ এবং জনস্বাস্থ্যের পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাওয়া।
যুদ্ধের মানবিক মূল্য: সংখ্যাগুলো কী বলছে
৩ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরানে অন্তত ২,০৭৬ জন নিহত এবং ২৬,৫০০ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো শুধু সংঘাতের তীব্রতাই দেখায় না, বরং এটাও বোঝায় যে যুদ্ধের প্রভাব কত দ্রুত বেসামরিক জীবনের গভীরে পৌঁছে গেছে। যখন নিহত ও আহতের পরিমাণ এত বড়, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণে বেড়ে যায়। আর ঠিক সেই সময়েই যদি হাসপাতাল, গবেষণাগার বা ওষুধ কারখানা আক্রান্ত হয়, তাহলে সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পাস্তুর ইনস্টিটিউট: প্রতীকি নাকি কৌশলগত লক্ষ্য?
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ইরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউট। দেশটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটিও লক্ষ্যবস্তু হয়। এটি সাধারণ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। ১৯২০ সালে প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট এবং ইরান সরকারের চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রকে ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব কয়েকটি স্তরে বোঝা যায়। এখানে সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা হয়, ভ্যাকসিন ও জৈব পণ্য উৎপাদন হয়, উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা দেওয়া হয়, এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করা হয়। গুটি বসন্ত, কলেরা—এরকম স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রোগ মোকাবিলায়ও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। টিটেনাস, হেপাটাইটিস বি, হাম—এসব রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত ভ্যাকসিন ও সংশ্লিষ্ট জৈব পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদনেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি গবেষণাগার নয়; জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।
এ কারণেই পাস্তুর ইনস্টিটিউট আক্রান্ত হওয়ার খবর অনেক বড় প্রশ্ন তুলেছে। যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠান টার্গেট হয়, তবে সেটি শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসও উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রতিষ্ঠানের দুটি বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিল। ফলে বিষয়টি এখন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রেসিডেন্টের আহ্বান কেন তাৎপর্যপূর্ণ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, যিনি পেশায় একজন হার্ট সার্জন, এই পরিস্থিতিকে শুধু রাজনৈতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করেননি। তিনি চিকিৎসক হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রেড ক্রস, ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স এবং বিশ্বের চিকিৎসকদের প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এই আবেদন আসলে একটি কূটনৈতিক বার্তাও বটে: ইরান চাইছে বিষয়টি যেন সামরিক সংঘাতের স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে, বরং মানবিক ও আইনি প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে তার প্রতিক্রিয়া শুধু স্থানীয় হয় না। আতঙ্ক তৈরি হয়, জরুরি চিকিৎসা ব্যাহত হয়, রোগীরা নিরাপদে স্থানান্তরিত হতে পারে না, চিকিৎসাকর্মীরা ঝুঁকিতে পড়েন, আর সাধারণ মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ভীত হয়ে ওঠে। ফলে একটি হামলার প্রভাব বহুস্তরীয়।
WHO যা বলছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে ইরানে স্বাস্থ্যসেবার ওপর ২০টির বেশি হামলা যাচাই করেছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মী এবং ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন সদস্যও আছেন।
এখানে “যাচাই করা হামলা” কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময়ে অনেক অভিযোগ ওঠে, পাল্টা অভিযোগও থাকে। কিন্তু WHO যখন নির্দিষ্ট সংখ্যক হামলা যাচাই করেছে বলে জানায়, তখন বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও ওজন পায়। এর অর্থ, স্বাস্থ্যখাতের ওপর আঘাতের অভিযোগগুলো কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
কোন কোন স্থাপনায় হামলার কথা বলা হচ্ছে
স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিচ্ছিন্ন নয়। বিভিন্ন ধরণের স্থাপনা এতে আক্রান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—ত্রাণগুদাম, ওষুধ কোম্পানি, মনোরোগ হাসপাতাল, সাধারণ হাসপাতাল—সবই এর মধ্যে আছে।
১) রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণগুদাম
শুক্রবার সকালে ইরানের বুশেহর প্রদেশে একটি ড্রোন হামলায় রেড ক্রিসেন্টের ত্রাণগুদাম আক্রান্ত হয়। এতে কেউ নিহত হয়নি বলে জানানো হলেও দুটি ত্রাণ কনটেইনার, দুটি বাস এবং জরুরি সেবা যানবাহন ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের সময় ত্রাণ ও জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব কতটা, সেটি বিবেচনায় নিলে এ ধরনের হামলা মানবিক সহায়তার সক্ষমতাকে সরাসরি দুর্বল করতে পারে।
২) তোফিঘ দারু
৩১ মার্চ তেহরানে ইরানের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি তোফিগ দারু গবেষণা ও প্রকৌশল কোম্পানি-এর ওপর হামলার কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যান্টিক্যানসার, নারকোটিকস, কার্ডিওভাসকুলার এবং ইমিউনোমডুলেটরি সেগমেন্টে সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান তৈরি ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ আছে। যুদ্ধের মধ্যে একটি ওষুধ কোম্পানি আক্রান্ত হওয়া মানে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খলেও আঘাত হানতে পারে। ক্যাজুয়ালটির নিশ্চিত সংখ্যা না জানানো হলেও এই হামলার কৌশলগত তাৎপর্য বড়।
৩) দেলারাম সিনা সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল
২৯ মার্চ তেহরানে নতুন নির্মিত দেলারাম সিনা সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার সময় সেখানে প্রায় ৩০ জন রোগী ছিলেন বলে হাসপাতাল পরিচালক জানিয়েছেন। মনোরোগ হাসপাতাল আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এমন রোগীদের সরিয়ে নেওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তর করা সাধারণ হাসপাতালের তুলনায় আরও জটিল হতে পারে। আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক সুরক্ষার পাশাপাশি মানসিক স্থিতিশীলতাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৪) আলি হাসপাতাল
ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আন্দিমেশকে ২১ মার্চ বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আলি হাসপাতালও। WHO-এর মহাপরিচালক পরে নিশ্চিত করেন, এই হামলার কারণে হাসপাতালটিকে কর্মীদের সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং সেবা বন্ধ করতে হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে একটি হাসপাতাল কাজ বন্ধ করে দিলে ক্ষতিটা কেবল ভবনের নয়—সেই এলাকার অসংখ্য মানুষ হঠাৎ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে।
৫) গান্ধী হাসপাতাল
২ মার্চ তেহরানে একটি টেলিভিশন যোগাযোগ টাওয়ারের কাছে হামলার সময় গান্ধি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও হাসপাতালের নিজস্ব হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি, ঘটনাটি দেখায় যে যুদ্ধক্ষেত্রে “কাছাকাছি আঘাত”ও বেসামরিক চিকিৎসা অবকাঠামোর জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এমন অনেক সময় হয়, প্রধান লক্ষ্য অন্য কিছু হলেও পাশের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রও কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
কেন স্বাস্থ্যখাত আক্রান্ত হওয়া এত ভয়াবহ
স্বাস্থ্যখাতে হামলার ভয়াবহতা বোঝার জন্য শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের মধ্যে যখন মানুষ আহত হয়, অপারেশন লাগে, ওষুধ লাগে, রক্ত লাগে, ভ্যাকসিন লাগে, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থাই হয়ে ওঠে সমাজের শেষ নিরাপদ স্তম্ভ। যদি সেই স্তম্ভই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে যুদ্ধের মানবিক মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় দিক হচ্ছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। পাস্তুর ইনস্টিটিউটের মতো জায়গা আক্রান্ত হলে তা কেবল বর্তমানে চিকিৎসা ব্যাহত করে না; ভবিষ্যতের রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, গবেষণা এবং মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, এর প্রভাব তাৎক্ষণিকের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদেও থেকে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চিকিৎসাকর্মী, অসুস্থ ও আহত ব্যক্তি, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের মতো চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থাও সুরক্ষার আওতায় থাকার কথা। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মতে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটকে আক্রমণ করা উচিত নয়।
এখানে ২০১৬ সালে গৃহীত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৮৬ নম্বর প্রস্তাবও গুরুত্বপূর্ণ। এটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছিল এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যখাতের ওপর হামলা থামেনি। বরং WHO-এর Surveillance System for Attacks on Health Care (SSA) অনুযায়ী, গত বছর সশস্ত্র সংঘাতে চিকিৎসা স্থাপনায় ১,৩৪৮টি হামলায় ১,৯৮১ জন নিহত হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় সুদানে ১,৬২০ জন, এরপর মিয়ানমারে ১৪৮ জন। ২০২৪ সালে যেখানে সশস্ত্র সংঘাতে ৯৪৪ জন রোগী ও চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছিলেন, তার তুলনায় এটিকে বড় উল্লম্ফন বলা যায়।
ইরান একা নয়: আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যখাতে হামলার অভিযোগ শুধু ইরান ঘিরেই নয়। প্রতিবেদনে লেবানন এবং গাজার উদাহরণও এসেছে। লেবাননে সর্বশেষ বোমাবর্ষণের এক মাসের মধ্যে ৫৩ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত, ৮৭টি অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস এবং ৫টি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে গাজায়ও হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী ও উদ্ধারকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
এই তুলনাগুলো দেখায়, স্বাস্থ্যখাত এখন অনেক সংঘাতে “অপ্রত্যক্ষ ক্ষতি” নয়, বরং ক্রমেই কেন্দ্রীয় মানবিক উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি দেশের সংকট নয়; আধুনিক যুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিতে পড়ছে, তার বড় উদাহরণ।
আসল উদ্বেগ কোথায়
ইরানে হাসপাতাল, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র এবং ত্রাণব্যবস্থার ওপর হামলার অভিযোগ যদি এইভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে তার প্রভাব কেবল বর্তমান যুদ্ধ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে ভ্যাকসিন ও ওষুধ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, জরুরি চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চিকিৎসা পাওয়ার নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হতে পারে।
আরও বড় বিষয় হলো—একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাত আক্রান্ত হলে তা সামরিক হিসাবের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক, নৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। কারণ যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা আর হাসপাতালের সেবা অচল করে দেওয়া—এই দুইয়ের মানবিক অভিঘাত এক নয়।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধের সীমা আর শুধু সীমান্ত, ঘাঁটি বা সামরিক যান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। এখন যুদ্ধের অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে ল্যাবরেটরি, হাসপাতালের ওয়ার্ড, ওষুধ তৈরির কারখানা এবং ত্রাণগুদাম পর্যন্ত।
এ কারণেই পাস্তুর ইনস্টিটিউট, তোফিঘ দারু, আলি হাসপাতাল, দেলারাম সিনা সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল বা গান্ধী হাসপাতালের মতো স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির খবর শুধু আলাদা কিছু ঘটনা নয়; এগুলো মিলে তৈরি করছে একটি বড় ছবি। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে—যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, মানবিক অবকাঠামো তত বেশি ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রশ্নটি এখন আরও জরুরি: স্বাস্থ্যসেবাকে কি সত্যিই যুদ্ধের বাইরে রাখা সম্ভব হচ্ছে, নাকি হাসপাতাল ও ওষুধও ধীরে ধীরে নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে?

