ইউএনআরডব্লিউএ-এর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান অন্য জাতিসংঘ সংস্থাগুলোকে ভেঙে ফেলার নজির স্থাপন করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির বিদায়ী কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি।
তিনি বলেছেন, যদি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনিদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এই একমাত্র সংস্থাটিকে ভেঙে ফেলার সুযোগ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিণতি ঘটতে পারে।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-কে দেওয়া তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে লাজারিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, ইউএনআরডব্লিউএ ভেঙে ফেলার ইসরায়েলের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা কেবল আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছে, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, “সংস্থাটি ব্যাপক আক্রমণের শিকার হয়েছে।”
লাজারিনি জানান, সংস্থার ৩৯১ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে শেখ জাররাহতে অবস্থিত ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করা হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় ইসরায়েলের সরকারি ও সংসদীয় কর্মকর্তারা উল্লাস প্রকাশ করেছেন।
তিনি আরো বলেন, সংস্থাটির বিরুদ্ধে অপতথ্য প্রচারণা চালানো হয়েছে, আইনি মামলার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তিনটি আইন পাস করা হয়েছে। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্যই ছিল সংস্থাটিকে ধ্বংস করা। লাজারিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর প্রতিক্রিয়ার অভাবে এসব হামলা দায়মুক্তির মধ্যেই ঘটেছে।
লাজারিনি দাবি করেন, ইউএনআরডব্লিউএ-তে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দাতা দেশগুলোকে আতঙ্কিত করার কৌশল। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন কলোনার নেতৃত্বে পরিচালিত এক তদন্তে দেখা গেছে, ইসরায়েল তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।
তবে অভিযোগ ওঠার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাজ্যসহ ১৬টি দাতা দেশ অর্থায়ন স্থগিত করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেন ছাড়া অধিকাংশ দেশ তাদের অনুদান পুনরায় চালু করে।
চাপ থাকা সত্ত্বেও লাজারিনি বলেন, ইউএনআরডব্লিউএ এখনো গাজায় জনস্বাস্থ্যসেবার প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে। সংস্থাটি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করে শিশুদের শেখার পরিবেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে আবাসিক এলাকা, স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ, গির্জা এবং বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে এবং চিকিৎসকেরা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রোগের বিস্তারও দ্রুত বাড়ছে।
লাজারিনির তথ্য অনুযায়ী, ইউএনআরডব্লিউএ বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার কর্মী নিয়ে গাজায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটি প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। প্রায় ৭০ হাজার শিশু সরাসরি শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে এবং ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে যুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তির সময় ইসরায়েল ১৯৪ নম্বর প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল, যেখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তাঁর মতে, ইউএনআরডব্লিউএ-এর বিরুদ্ধে বর্তমান অভিযান সেই অধিকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংস্থাটি ভেঙে দেওয়া হলেও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মর্যাদা নষ্ট হবে না। রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই মর্যাদা ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও বহাল থাকবে।
লাজারিনি জানান, সংস্থাটি বর্তমানে তীব্র অর্থসংকটে রয়েছে। বিশেষ করে আরব দেশগুলোর অনুদান ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো সংস্থাটিকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ সহায়তা না পেলে ভবিষ্যতে ইউএনআরডব্লিউএ কার্যকরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংকট এবং রাজনৈতিক চাপ সংস্থাটির কার্যক্রমকে সংকুচিত করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে এবং সুইডেনও সরে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লাজারিনি আরও বলেন, বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার দিকে সরায় গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর প্রতিদিন ৮০০ ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক কম ছিল।
সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, গাজার প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক জরুরি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাকগুলো আংশিকভাবে বোঝাই করে পাঠানো হচ্ছে।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম আনতে পারছে না। সংস্থাটির এক প্রতিনিধি জানান, দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম এবং জরুরি যন্ত্রপাতির তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
লাজারিনি ইসরায়েলের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন যে, অন্য জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-কে প্রতিস্থাপন করতে পারবে। তাঁর মতে, এমন কোনো সংস্থা নেই যা একই পরিসরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম।
তিনি বলেন, ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রকৃত বিকল্প হতে হলে একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের শিক্ষা দিয়ে আসছে এবং এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গাজায় একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতিও ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
- সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

