মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ—
একটি নতুন তদন্ত অনুযায়ী, সিরিয়ার সরকার আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের নারীদের অপহরণ, গুম-সহিংস ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে লঘু করে দেখাচ্ছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে- প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছে যে, তারা কেবল একজন আলাওয়াইট নারীকে অপহরণকারীর লক্ষ্যবস্তু করার একটি ঘটনাই নিশ্চিত করেছে।
তবে, নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নতুন তদন্তে আলাওয়াইট নারী ও মেয়েদের অন্তত ১৩টি অপহরণের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে। নিশ্চিত হওয়াদের মধ্যে পাঁচজন জানিয়েছেন যে, বন্দিদশায় থাকাকালীন তারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে দুজন গর্ভবতী অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন।
এই তদন্ত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে, যারা জুলাই মাসে জানিয়েছিল যে তাদের কাছে একই ধরনের ৩৬টি অপহরণের বিশ্বাসযোগ্য খবর রয়েছে।
এছাড়া সিরিয়ান ফেমিনিস্ট লবির প্রতিবেদনও এর অন্তর্ভুক্ত, যারা হিসাব করে জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের শুরু থেকে ৮০ জন আলাওয়াইট নারী ও মেয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।
অপহৃতদের মধ্যে কয়েকজন বলেছেন, তাঁদের ওপর সাম্প্রদায়িক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং তাঁরা এই অপহরণকে আসাদ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যরা সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অপরাধমূলক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক নারীর পরিবার জানিয়েছে, তারা অপহরণকারীদেরকে ১৭,০০০ ডলার পাঠিয়েছিল, কিন্তু তারা তাকে কখনো মুক্তি দেয়নি।
আরেকজন ২৪ বছর বয়সী নারী জানান, তাকে তিন সপ্তাহ ধরে একটি নোংরা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, যেখানে তাকে বারবার ধর্ষণ ও মারধর করা হয় এবং তার মাথা ও ভ্রু ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। তাকে রেজার ব্লেড দিয়েও কাটা হয়েছিল। তার বাবা-মা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
প্রতিশোধমূলক হামলা
আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে নতুন সরকার ও আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা চরমে রয়েছে।
গত বছর, উপকূলীয় আলাওয়াইট অধ্যুষিত লাতাকিয়া অঞ্চলে আসাদ-অনুগত বলে সন্দেহভাজনদের দ্বারা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা নৃশংস সাম্প্রদায়িক রক্তপাতে রূপ নেয়।
পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ১,৫০০ আলাওয়াইট নিহত হন এবং রয়টার্সের এক তদন্তে এই সহিংসতার একটি বড় অংশের জন্য দামেস্কের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নুর আল-দিন বাবা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, সংবাদমাধ্যমটি যাদের সঙ্গে কথা বলেছে তাদের নাম না জানালে তিনি এই তদন্ত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। পত্রিকাটি তাদের পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন যে, নভেম্বরে প্রকাশিত একটি সরকারি তদন্তের পক্ষে তিনি আছেন, যেটিতে ৪২টি অপহরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখে পাওয়া গিয়েছিল যে সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটিই ছিল “প্রকৃত”।
সিরিয়ার ১৩ বছরের যুদ্ধ, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তার সূত্রপাত ঘটে ২০১১ সালে, যখন সরকারি বাহিনী গণতন্ত্রপন্থী কর্মীদের ওপর গুলি চালায়।
যদিও প্রাথমিকভাবে কিছু আলাওয়াইট গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু সরকারি নিপীড়ন এবং বিরোধীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বিস্তার নিয়ে ভয়ের কারণে সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই আসাদের পক্ষে সমর্থন জানায়।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাচ্যুতি ও মস্কোতে পলায়নের পর থেকে সাম্প্রদায়িক প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য আলাওয়াইটদের পক্ষ থেকে আহ্বান ক্রমশ বাড়ছে।
মঙ্গলবার লন্ডন সফরকালে শারা আলাওয়াইট এবং আলেভিদের (একটি অনুরূপ, সাধারণত তুর্কি বা কুর্দি সম্প্রদায়) প্রতিবাদের সম্মুখীন হন, যারা তাকে সিরিয়ায় ‘গণহত্যা’য় সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করে।
“এমন এক সময়ে যখন সিরীয়রা বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রান্তিকতার শিকার হচ্ছে, তখন এই ধরনের একজন ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়াটা ভুল বার্তা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে: যে জবাবদিহিতা উপেক্ষা করা যেতে পারে এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যেতে পারে” বলেছেন যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক আলাওয়াইটদের অধিকার রক্ষাকারী সংস্থা সিরিয়ান কোস্টাল সোসাইটি (এসিসি)-এর পরিচালক মাহের হামাদৌচ।
হামাদৌচ, যিনি পূর্বে সিরিয়ায় আসাদের শাসনের পক্ষে কথা বলেছেন, সূত্রকে বলেছেন যে এসসিএস যুক্তরাজ্য সরকারকে “চরমপন্থী কার্যকলাপ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের প্ল্যাটফর্ম বা বৈধতা” অস্বীকার করার আহ্বান জানাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, “[শারার] কর্মকাণ্ড সিরিয়ায় সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর দমন-পীড়নের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত”।

