ইরানের সামরিক বাহিনী মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ মিসাইল বাঙ্কার ও সাইলো (মিসাইল মজুতের ঘাঁটি) মেরামত করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তুলছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের হাতে এখনও বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চার মজুত রয়েছে, যা ইরান প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমেরিকা ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম পাঁচ সপ্তাহে ইরানের ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করেছে এবং তা উল্লেখযোগ্য সাফল্য দিয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের মতে, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও অনেক দূরে। তেহরান এখনো তাদের হাতে থাকা মিসাইল ও লঞ্চার দিয়ে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আঘাত হানতে সক্ষম।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। ইরানের নৌবাহিনী কার্যত নিশ্চিহ্ন, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত এবং ইরানের আকাশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দারা মনে করছেন, ইরানের হামলা কমে যাওয়ার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। ইরান তাদের অধিকাংশ মিসাইল লঞ্চার পাহাড়ের গুহা বা মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে। সুযোগ পেলেই এগুলো পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান লঞ্চার অক্ষত রাখার মাধ্যমে দুইটি লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছে—যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং যুদ্ধশেষে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা।
যদিও অস্ত্রের মজুত কমেছে বা লঞ্চারের ব্যবহার সীমিত হয়েছে, তেহরান ইসরায়েলের ওপর আঘাত চালানো বন্ধ করেনি। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইরান দৈনিক গড়ে ২০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ে এবং ৫০–১০০টি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোন ব্যবহার করে। তবে কখনও কখনও একটি বা দুটি মিসাইলও ছোড়া হচ্ছে।
ইরানের প্রকৃত মিসাইল সক্ষমতা নিয়ে এখনও বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। কারণ তেহরান প্রচুর পরিমাণে নকল বা ছদ্মবেশী লঞ্চার ব্যবহার করছে। ফলে মার্কিন পক্ষ যেসব লঞ্চার ধ্বংসের দাবি করছে, তার মধ্যে কতগুলো আসল তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। এছাড়া যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে ঠিক কতসংখ্যক লঞ্চার ছিল, তার নিখুঁত পরিসংখ্যানও ওয়াশিংটনের কাছে নেই। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ের গুহা বা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ঠিক কত লঞ্চার রয়েছে, তা নির্ধারণ করাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মনে হলেও আদতে অনেক বাঙ্কার, গুহা বা সাইলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ইরান দ্রুত মাটি খুঁড়ে লঞ্চার বের করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তুলছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, তেহরান বুলডোজার ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে চাপা পড়া লঞ্চারগুলো খুঁড়ে বের করছে।
এভাবে ইরান তার মিসাইল শক্তি বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে রাখছে। ফলে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আক্রমণক্ষমতা এখনও উল্লেখযোগ্য।

