দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির একটি বড় ভিত্তি ছিল এই বিশ্বাস যে, তারা দূরের দেশে যুদ্ধ শুরু করতে পারবে, প্রতিপক্ষকে বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারবে, কিন্তু নিজের কাঁধে তুলনামূলক কম চাপ নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। এই ধারণা শুধু সামরিক চিন্তায় নয়, রাজনৈতিক ভাষণেও গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত সেই পুরোনো ধারণাকে নেড়ে দিয়েছে।
১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সফল হয়েছে এবং তিনি খুব দ্রুত এই অধ্যায় শেষ করার কথাও জানান। কিন্তু বাস্তবতা তার কথার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কারণ যুদ্ধ কেবল হামলা চালানোর ক্ষমতার নাম নয়, পাল্টা আঘাত সহ্য করার ক্ষমতাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এই জায়গাতেই ইরান দেখিয়েছে, তাকে অতীতের অনেক প্রতিপক্ষের মতো একপেশে চাপ দিয়ে কোণঠাসা করা সহজ নয়।
অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এমন সব দেশকে আঘাত করেছে, যারা পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমিত ছিল। গ্রেনাডা, পানামা, ইরাক, লিবিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো উদাহরণ দেখালে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন বহু সময় এমন প্রতিপক্ষ বেছে নিয়েছে, যাদের ওপর সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা তুলনামূলকভাবে সহজ। এমনকি ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ ভোগান্তির মুখে পড়লেও, সেই লড়াইগুলো বেশিরভাগ সময় নির্দিষ্ট ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের খরচ বাড়লেও তা বিস্তৃত আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করে মিত্রদের ঘাড়ে একই মাত্রায় গিয়ে পড়েনি।
ইরান এই হিসাবটাই পাল্টে দিয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক প্রতিরক্ষা ভাবনা, যেখানে নিজের সীমান্তের ভেতরে অপেক্ষা না করে আগেভাগেই প্রভাব বিস্তার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র, দূরনিয়ন্ত্রিত আঘাতের সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রবলয় এবং বিস্তৃত প্রতিরোধব্যবস্থা মিলিয়ে ইরান এমন এক অবস্থান গড়ে তুলেছে, যাতে তাকে আঘাত করা মানেই শুধু একটি দেশের সঙ্গে লড়াই নয়, বরং একটি ছড়িয়ে থাকা প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান যে দ্রুত বিভিন্ন জায়গায় চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে, তা দেখিয়েছে তাদের প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান এই সংঘাতের খরচ শুধু নিজের ঘাড়ে রাখেনি। তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও তার মূল্য দিতে হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে ঝুঁকির মধ্যে এনে ইরান কার্যত জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ যদি শুরু হয়, তাহলে তার ধাক্কা শুধু একটি পক্ষেই থাকবে না। ফলে যেসব আঞ্চলিক রাষ্ট্র এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে নিজেদের স্বস্তিতে ভাবত, তারাও এখন নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখনও কখনও নিরাপত্তা নয়, বরং বাড়তি ঝুঁকিও ডেকে আনতে পারে।
এই বাস্তবতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২০ সালে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান সরাসরি ইরাকের আল-আসাদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এই ঘটনা ছিল বড় এক ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে বোঝা গিয়েছিল, ইরান শুধু পরোক্ষ প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রয়োজনে তারা সরাসরি আমেরিকার সামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্য করতে পারে। তারপরের সময়টায় তারা এই কৌশল আরও সুসংগঠিত করেছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ভুল ধারণাও সামনে আসে। বহুদিন ধরে আমেরিকার নীতিনির্ধারণী পরিসরে এমন একটি বিশ্বাস কাজ করেছে যে, প্রতিরক্ষা খাতে বেশি অর্থ ব্যয় মানেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত আধিপত্য। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা এত সরল নয়। ইতিহাস বলছে, বিপুল সামরিক ব্যয় থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত বহু সংঘাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। ফলে শুধু অর্থের পরিমাণ বা অস্ত্রের আধুনিকতা দিয়ে সব সময় ফল নির্ধারিত হয় না।
ইরান এখানেই আলাদা ধরনের হিসাব নিয়ে এগিয়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু ইরানের লক্ষ্য শক্তিতে সমান হওয়া নয়; বরং প্রতিপক্ষের স্বস্তি নষ্ট করা, ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া, এবং দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করা। এই কৌশলকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি অস্ত্র, দূরনিয়ন্ত্রিত হামলা ব্যবস্থা ও ধারাবাহিক চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি অর্থ খরচ করে প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ, একটি সস্তা আক্রমণ ঠেকাতে কখনও অনেক দামী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। এই অসম ব্যয়ের লড়াই দীর্ঘমেয়াদে বড় শক্তিকেও চাপে ফেলে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি, অর্থাৎ তার বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি, এখন উল্টো দুর্বলতার উৎস হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি, অগ্রবর্তী মোতায়েন, মিত্রদের সুরক্ষার দায়—সব মিলিয়ে তাদের যে বিশাল কাঠামো, সেটি রক্ষা করতে বিপুল ব্যয় লাগে। অন্যদিকে ইরান অপেক্ষাকৃত কম খরচে সেই কাঠামোর নানা জায়গায় চাপ তৈরি করতে পারে। এই অবস্থায় যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে ধৈর্য, ব্যয়, সহনশীলতা এবং কৌশলগত চাপের লড়াই।
এই কারণেই বর্তমান সংঘাতকে শুধু দুটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এটি আসলে আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন আর শুধু বড় বাহিনী, ভারী অস্ত্র বা বিশাল বাজেট দিয়ে সব যুদ্ধের ফল নির্ধারিত হয় না। বরং ভৌগোলিক বিস্তার, অর্থনৈতিক সংযোগ, কম খরচের কার্যকর আঘাত, এবং প্রতিপক্ষের জোটের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করার ক্ষমতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরান দেখিয়েছে, তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেখালেও একটি রাষ্ট্র যদি বহু বছর ধরে ধৈর্য নিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করে, আঞ্চলিক গভীরতা অর্জন করে, এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গাগুলো বুঝে কৌশল সাজায়, তাহলে সে বড় শক্তিকেও সমস্যায় ফেলতে পারে। এখানে প্রশ্ন কেবল কে বেশি শক্তিশালী, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কে প্রতিপক্ষের জন্য যুদ্ধকে বেশি ব্যয়বহুল, বেশি জটিল এবং বেশি অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কি এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেবে? কারণ এখনও তাদের হাতে বিপুল ধ্বংসক্ষমতা আছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকলেই যুদ্ধের পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তুলনায় ছোট শক্তিও বড় শক্তির পরিকল্পনা ভেঙে দিতে পারে, তার মিত্রদের চাপে ফেলতে পারে, এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়কে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে জয় পেলেও তার মূল্য অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে এই উপলব্ধির ওপর। যদি যুক্তরাষ্ট্র এখনও পুরোনো ধারণাতেই আটকে থাকে—যে, চাপ সৃষ্টি করলেই প্রতিপক্ষ নতি স্বীকার করবে—তাহলে সামনে আরও এমন সংঘাত তৈরি হতে পারে, যেগুলো শুরু করা সহজ হলেও শেষ করা কঠিন হবে। আর যদি এই শিক্ষা তারা নিতে পারে, তাহলে হয়তো তারা বুঝবে, আজকের বিশ্বে যুদ্ধ মানে শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং প্রতিক্রিয়ার বিস্তার, ব্যয়ের গভীরতা এবং কৌশলগত ফলাফলের দীর্ঘ ছায়াও।

