মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি এসে পড়েছে বৈশ্বিক মানবিক পরিস্থিতির ওপর। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছানো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা দ্রুতই একটি ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সংঘাতের ফলে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এর সঙ্গে দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। ফলে ত্রাণ পরিবহনের খরচ বেড়ে গেছে, আর একই অর্থে আগের তুলনায় অনেক কম সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, তাদের হাজার হাজার মেট্রিক টন খাদ্যসামগ্রী বিভিন্ন রুটে আটকে রয়েছে। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (IRC) জানিয়েছে, সুদানের জন্য নির্ধারিত ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের ওষুধ দুবাইয়ে আটকে আছে। একইসঙ্গে সোমালিয়ার অপুষ্ট শিশুদের জন্য পাঠানো প্রায় ৬৭০ বাক্স খাদ্য ভারতে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) জানিয়েছে, অন্তত ১৬টি দেশে জরুরি সরঞ্জাম পাঠাতে দেরি হচ্ছে।
জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের পর এটি সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট, যেখানে পরিবহন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। একই সময়ে নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে—ইরান ও লেবাননের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে এবং শুধু লেবাননেই অন্তত ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা সংস্থাগুলো এখন বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে সময় কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, আগে সরাসরি বিমানে ইরানে টিকা পাঠানো সম্ভব হলেও এখন তুরস্ক হয়ে স্থলপথে নিতে হচ্ছে, এতে সময় বেড়েছে প্রায় ১০ দিন এবং খরচ বেড়েছে ২০ শতাংশ।
এই বাড়তি ব্যয়ের কারণে সংস্থাগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যে কতজনকে সহায়তা দেওয়া হবে বা কতটুকু সরঞ্জাম কেনা যাবে—এই প্রশ্নে এখন তাদের বেছে নিতে হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, তাদের মজুদ থাকা পণ্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব স্থানীয় পর্যায়েও মারাত্মকভাবে পড়ছে। সোমালিয়া ও নাইজেরিয়ায় পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিতে পারছে না। নাইজেরিয়ায় জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ক্লিনিকগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও সংকটে পড়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, যদি জুন পর্যন্ত এই সংঘাত অব্যাহত থাকে, তাহলে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩২ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে রয়েছে, যা এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এছাড়া বৈশ্বিক কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সার হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় চাষাবাদের মৌসুমের আগে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে ক্ষুদ্র কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ সার বাণিজ্য সচল রাখতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। তবে সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, শুধু বিকল্প পথ বা বাড়তি অর্থায়ন দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়—যুদ্ধবিরতি ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান নেই।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনায় এই সংঘাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যাচ্ছে, কারণ অনেক দেশ এখন নিজেদের নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা বিশ্বে মানবিক সহায়তায় অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ হিসেবে লেবাননের জন্য অতিরিক্ত ৫ কোটি ডলার জরুরি সহায়তা দিচ্ছে, যা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানোর পথ বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব পড়বে বিশ্বের কোটি মানুষের জীবনে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে।

