ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কয়েক সপ্তাহের নিরলস মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান এখনও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তার রকেট এবং ড্রোনের বিশাল অস্ত্রাগার ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। সূত্র: ডেইলি মেইল
এই সক্ষমতার মূলে রয়েছে ইরানের দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা দুর্ভেদ্য ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ বা ‘মিসাইল সিটি’ নেটওয়ার্ক। এই স্থাপনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারিকেও উপেক্ষা করে টিকে রয়েছে।
ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ইয়াজদ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিটি এই নেটওয়ার্কের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি কোনো সাধারণ বাঙ্কার নয়, বরং গ্রানাইট পর্বতের প্রায় ৫০০ মিটার (১৬০০ ফুটের বেশি) গভীরে তৈরি এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। পৃথিবীর অন্যতম কঠিন শিলা দিয়ে তৈরি হওয়ায় স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেন্ট্রেটর— এর আঘাতও সরাসরি সহ্য করতে সক্ষম। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের স্থাপনা ধ্বংস করতে হলে একই পয়েন্টে একাধিক সুনির্দিষ্ট হামলা এবং অভ্যন্তরীণ বিন্যাসের বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন।

ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা
ইয়াজদ ঘাঁটির পাহাড়ের ভেতরটি একটি সাধারণ সামরিক ঘাঁটির চেয়েও বড়, এটি আসলে একটি গোপন শহরের মতো। ধারণা করা হয়, এখানে একটি স্বয়ংক্রিয় রেল ব্যবস্থা রয়েছে যা টানেলগুলোর মাধ্যমে সংযোজন এলাকা, স্টোরেজ ডিপো এবং পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে থাকা একাধিক গোপন বহির্গমন পথকে সংযুক্ত করে। ইরানি প্রোপাগান্ডা ভিডিওতে দেখা যায়, লরি বা ট্রাকে করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকগুলোকে অত্যন্ত দ্রুত স্থানান্তর করা হয়, বাইরে এনে ফায়ার করা হয় এবং চোখের পলকে আবার ভারী সাঁজোয়া দরজার আড়ালে ভূগর্ভে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই দ্রুত গতিবিধি এবং গোপনীয়তা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ধ্বংস করার জন্য অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহের নিরলস হামলা সত্ত্বেও ইরান এখনও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তার গোপন রকেট এবং ড্রোনের অস্ত্রাগার ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) এর মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইয়াজদ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতেই অন্তত ছয়বার হামলা চালানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও, ২৮ মার্চের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সেখান থেকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। যদিও এই উৎক্ষেপণগুলো হামলার আগে নাকি পরে, তা স্পষ্ট নয়। তবে, এটি ইরানের ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থাটির স্থিতিস্থাপকতা এবং কার্যকারিতার প্রমাণ দেয়।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
ইরানজুড়ে এ ধরনের আরও অনেক ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ রয়েছে, যা দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে একটি বিস্তৃত ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বছরের পর বছর ধরে এই বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এই গভীর বাঙ্কারগুলো তৈরি করেছে। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পরও ইরানের হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বেশিরভাগই অক্ষত ছিল।
এখন মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ইরানের এখনও অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ইরানের এখনও উল্লেখযোগ্য ফায়ারপাওয়ার বা যুদ্ধক্ষমতা রয়েছে। এই অনুমানে এমন উৎক্ষেপকও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা হামলার কারণে সাময়িকভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়, কিন্তু ধ্বংস হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশও অক্ষত রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালীর নৌ-চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের প্রায় ৪৭০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ছিল বলে ইসরায়েলের অনুমান। গত মাসে তারা দাবি করেছিল যে এর প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংস বা অকার্যকর করা হয়েছে। তবে, বর্তমান গোয়েন্দা তথ্য নির্দেশ করে যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ইসরায়েলের দাবির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সংঘাতের আশঙ্কা
বর্তমান সংঘাতের শুরু থেকেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। হামলাগুলোর ফলে প্রবেশপথ ধসে গেছে, ভেন্টিলেশন শ্যাফ্ট বা বাতাস চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উপরিভাগের স্থাপনাসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, ভূগর্ভের গভীরের ব্যবস্থাটি অক্ষত রয়েছে।
সিএনএন-এর সাম্প্রতিক এক তদন্তে দেখা গেছে, টানেলের দৃশ্যমান প্রবেশপথগুলোর ৭৭ শতাংশে হামলা চালানো হলেও, সেই সাইটগুলোতে কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় শুরু হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই নির্মাণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে এবং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে পাহাড়ের ভেতর প্রবেশ পথগুলো খুলে দিতে দেখা গেছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রকাশ করা ফুটেজে দেখা গেছে, একটি স্থাপনার ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ ড্রোনের দীর্ঘ সারি সাজানো রয়েছে এবং টানেলের গভীরে ট্রাকগুলো উৎক্ষেপক নিয়ে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল অসুবিধা হলো অস্ত্রগুলো যেখানে রাখা আছে সেই স্থাপত্যে প্রবেশ করা। গ্রাউন্ড অপারেশনের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের কোনো সহজ বিকল্প নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত গভীর এবং জটিল টানেল সিস্টেমে বিশেষ বাহিনী পাঠানো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং কার্যকর করা কঠিন হবে। প্রতিটি সাইটকে আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হবে, যা সফল হওয়া খুব কঠিন।
কয়েক সপ্তাহের ক্রমাগত বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবারের তীব্র হামলায় কুয়েতের একটি তেল শোধনাগার ও ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং আবুধাবির একটি বড় গ্যাস কমপ্লেক্সে আঘাত হানা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান দাবি করেছে যে, তারা দ্বিতীয় একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।

সংঘাতের ভবিষ্যৎ ও ট্রাম্পের অবস্থান
এই সংঘাতের সমাধান কীভাবে হবে তা স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘পাথরের যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, আবার পরক্ষণে দাবি করছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে জয়ী হয়েছে। তার মতে, পরবর্তী লক্ষ্য হলো সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই অনিশ্চয়তা ইরানকে তার ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এবং মার্কিন হামলাকে উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
যদিও মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করছেন যে ইরানের যুদ্ধশক্তি কমেছে। কিন্তু তেহরান বহু বছর ধরেই এমন হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। তারা জানে, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তাদের কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। এর মধ্যে প্রধান হলো বিশ্বজুড়ে তেলের জোগানের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দুর্বলতা।

তাই, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব কঠিন হবে। ইরান শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতি বা তাদের কর্মকর্তাদের হত্যা বন্ধের মতো সাধারণ দাবিই করছে না; তারা মার্কিন বোমাবর্ষণে হওয়া ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চাইছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একচ্ছত্র অধিকারের গ্যারান্টিও দাবি করছে।
এদিকে, ইরানের হামলার গতি আগের চেয়ে কমলেও তা পুরোপুরি থেমে যায়নি, বরং একটা নিয়মিত ছন্দে চলছে। এর মানে হলো, তাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও সচল রয়েছে। গ্রানাইট পাথরের পাহাড়ের নিচে এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে সুরক্ষিত রাখছে। ফলে, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই ইরান টিকে আছে।
সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থার ওপর ভরসা রেখেই ইরান আমেরিকার হামলাকে উপেক্ষা করার সাহস দেখাচ্ছে।

