ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে একটি বিষয় বহুদিন ধরেই পরিষ্কার—তিনি প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে ভালোবাসেন। আর সেই চ্যালেঞ্জের নতুনতম লক্ষ্য এখন ন্যাটো। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটটিকে তিনি কখনো “কাগুজে বাঘ” বলছেন, কখনো এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, আবার কখনো এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন যেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোতে থাকার দিন ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি সত্যিই এমন কিছু করতে পারবেন? নাকি এটি চাপ সৃষ্টি করার পুরোনো ট্রাম্প-শৈলীর আরেকটি রাজনৈতিক কৌশল?
এই বিতর্ককে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এখানে শুধু একটি সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তিই আলোচনায় উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই কেন বাড়ছে আপত্তি
ট্রাম্পের ন্যাটোবিরোধী বক্তব্যে শুধু ডেমোক্র্যাট নয়, রিপাবলিকান শিবিরেরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি আর কেবল দলীয় বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কৌশল, নিরাপত্তা দর্শন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্ন।
গত ২ এপ্রিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ এপ্রিল মার্কিন সিনেটের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ উপকমিটির সদস্য রিপাবলিকান নেতা মিশ ম্যাককনেল এবং ডেমোক্র্যাট নেতা ক্রিস কুনস ট্রাম্পের ন্যাটো-বক্তব্য নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেন। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ: ন্যাটোর সেনারা আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিনদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে, জীবন দিয়েছে, তাই মিত্রদের প্রতিশ্রুতি ও ত্যাগকে যুক্তরাষ্ট্রের অবহেলা করা উচিত নয়।
এই অবস্থান শুধু অতীতের কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে নয়; এর মধ্যে ছিল বর্তমানের নিরাপত্তা-রাজনীতির বাস্তব হিসাবও। তাঁদের মতে, ন্যাটো শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রও নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ, ন্যাটোকে শুধু “ইউরোপকে রক্ষার একটি ব্যবস্থা” হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রভাবেরও একটি মূল কাঠামো।
ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরুদ্ধে এর আগের দিন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসে। সিনেটের ন্যাটো পর্যবেক্ষণ দলের দুই সহ-সভাপতি—রিপাবলিকান টম টিলিস ও ডেমোক্র্যাট জেনি শাহিন—যৌথভাবে বলেন, যখন মার্কিনিদের ওপর আঘাত এসেছে, ন্যাটো তখন আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ন্যাটোর সহায়তার কথা তাঁরা উল্লেখ করেন। তাঁদের আশঙ্কা আরও স্পষ্ট: যদি কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যান, তাহলে তা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বড় কৌশলগত স্বপ্ন পূরণ করবে।
এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়—ট্রাম্পের ন্যাটো-বিরোধিতা কেবল একটি “অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান” নয়; এটি বিশ্বশক্তির ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের অভিযোগ: ন্যাটো কি শুধু ইউরোপের সুবিধার জোট?
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অভিযোগ মোটামুটি একই: ইউরোপ সমস্যায় পড়লে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন চাপে পড়ে, তখন ন্যাটো বা ইউরোপীয় মিত্ররা একইভাবে পাশে দাঁড়ায় না। সাম্প্রতিক বক্তব্যেও তিনি এই যুক্তিই সামনে এনেছেন।
তার অভিযোগের কেন্দ্রে আছে ইরান-সংকট এবং হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কার্যত অচল হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালি রক্ষায় ইউরোপীয় দেশগুলো যথেষ্ট এগিয়ে আসছে না। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে “পারস্পরিক নিরাপত্তা”র ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিতে এই বক্তব্য ট্রাম্প-সমর্থকদের কাছে খুব কার্যকর। কারণ এতে তিনি নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, যিনি “অন্যদের নিরাপত্তার বিল” আর দিতে চান না। কিন্তু বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ বলছেন, এই অভিযোগ অর্ধসত্য। কারণ বাস্তবতা হলো, আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছিল। আবার টুইন টাওয়ার হামলার পরও জোটটি আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
এখানে ট্রাম্পের বক্তব্যের রাজনৈতিক শক্তি আছে, কিন্তু কৌশলগত দুর্বলতাও আছে। তিনি যে অসন্তোষের কথা বলছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশের মধ্যে জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় মিত্রতা শুধু “আজ কে কাকে কত দিল”—এই অঙ্কে চলে না। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ, কৌশলগত উপস্থিতি, পরমাণু ছাতা এবং শক্তির সংকেত—সবকিছু মিলেই জোটের মূল্য নির্ধারিত হয়।
“কাগুজে বাঘ” মন্তব্য কেন এত আলোড়ন তুলেছে
ট্রাম্প যখন ন্যাটোকে “কাগুজে বাঘ” বলে কটাক্ষ করেন, তখন বিষয়টি শুধু আরেকটি রাজনৈতিক মন্তব্য থাকে না। এটি পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত করে। দ্য গার্ডিয়ান-এর ১ এপ্রিল-এর একটি প্রতিবেদনে এই প্রশ্নই তোলা হয়—ট্রাম্প কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরিয়ে আনতে পারেন, আর তিনি এমনটি ভাবছেন কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্পের নেতিবাচক মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেই ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ন্যাটোকে অনেকে শুধু একটি সামরিক চুক্তি হিসেবে দেখেন, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ কাঠামোও। ইউরোপে মার্কিন ঘাঁটি, পরমাণু সক্ষমতা, এবং সমন্বিত সামরিক কমান্ড—এসব মিলিয়ে ন্যাটো শত্রুপক্ষকে আগ্রাসন থেকে বিরত রাখে।
এই জোটে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পরমাণু শক্তিধর দেশ আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমার সংখ্যা তাদের তুলনায় বেশি। ইউরোপজুড়ে মার্কিন সেনাঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা থাকার কারণে সম্ভাব্য শত্রুরা জানে, ইউরোপে হামলা মানে শুধু ইউরোপ নয়, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়া। তাই ন্যাটোর শক্তি কেবল কাগজের চুক্তিতে নয়, তার বাস্তব সামরিক উপস্থিতিতেও।
এই জায়গাতেই ট্রাম্পের মন্তব্যকে “চরম ধাক্কা” বলা হচ্ছে। কারণ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দুর্বল বলে মনে হয়, তাহলে জোটের প্রতিরোধ-ক্ষমতাও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ট্রাম্প কি সত্যিই ন্যাটো ছাড়ার ক্ষমতা রাখেন?
এখন আসল প্রশ্নে আসা যাক।
আইনগতভাবে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা নয়। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া আইনে বলা হয়েছে যে ন্যাটো থেকে বের হওয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমতি অথবা সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। অন্যদিকে রয়টার্স ২ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৩ সালে কংগ্রেসে পাস হয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সই করা আইনে উল্লেখ করা হয় যে, ন্যাটো থেকে সরে আসতে একজন রাষ্ট্রপতিকে ১০০ সদস্যের সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের অনুমোদন নিতে হবে।
অর্থাৎ, প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ইচ্ছাই এখানে শেষ কথা নয়—কমপক্ষে কাগজে-কলমে।
তবে এখানেই আরেকটি বড় জটিলতা আছে। মার্কিন সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে সিনেটের সঙ্গে পরামর্শ করে চুক্তি করার ক্ষমতা দেয়, কিন্তু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলে না। ন্যাটো চুক্তির ১৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সদস্য জোট ছাড়তে চাইলে এক বছরের নোটিশ দিয়ে মার্কিন সরকারকে জানাতে হবে, এরপর ওয়াশিংটন ডিসি বাকি সদস্যদের তা জানাবে।

কিন্তু ট্রাম্পকে নিয়ে সংশয় অন্য জায়গায়। তিনি এর আগেও কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ইরানে হামলার আগে কংগ্রেসের অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা নেননি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট অনুসারে, একজন রাষ্ট্রপতির কংগ্রেসের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। আবার ২০২০ সালে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া একাধিক চুক্তি থেকে বেরিয়েও আসেন, যার মধ্যে ৩৫-জাতির বেসামরিক উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত “ওপেন স্কাইস” চুক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, “ট্রাম্প পারবেন কি পারবেন না” প্রশ্নের আইনি উত্তর একরকম হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা আরেকরকম। সাবেক ওবামা প্রশাসনের ন্যাটো রাষ্ট্রদূত ইভো দালদার মনে করেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাম্প সব মার্কিন সেনা ও কর্মকর্তাকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। অর্থাৎ, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো না ছাড়লেও, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে এমনভাবে কমিয়ে দিতে পারেন যাতে জোট কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই কারণেই অনেকের চোখে প্রশ্নটি এখন আর শুধু “তিনি ন্যাটো ছাড়তে পারবেন কি না” নয়; বরং “তিনি ন্যাটোকে ভেতর থেকে কতটা ফাঁপা করে দিতে পারবেন।”
রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ন্যাটোর বাস্তব প্রয়োজনীয়তা
ন্যাটোর গুরুত্ব বোঝার জন্য আজকের ইউরোপের নিরাপত্তা মানচিত্রের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে, কিন্তু ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়। তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তি খুব পরিষ্কার: ইউক্রেন যদি একা ভেঙে পড়ে, তাহলে তার অভিঘাত ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাবেও পড়ে।
উৎস-ভিত্তিক আলোচনায় বলা হয়েছে, গত ৫ বছর ধরে ইউক্রেনে ন্যাটো দেশগুলো রুশ আগ্রাসন ঠেকিয়ে রেখেছে। আর এই বাস্তবতাই দেখায়, ন্যাটো আজও কেবল অতীতের শীতল যুদ্ধের জোট নয়; এটি বর্তমানের ভূরাজনীতিতেও সক্রিয় শক্তি।
এখানে ট্রাম্পের অবস্থান পশ্চিমা বিশ্বের জন্য কেন অস্বস্তিকর, তা বোঝা সহজ। যদি ওয়াশিংটন থেকে বার্তা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র আর পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, তাহলে মস্কোর কৌশলগত হিসাব বদলে যেতে পারে। একইসঙ্গে বেইজিংও তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। তাই ওয়াশিংটনে ন্যাটো-প্রশ্নটি শুধু ব্যয়ের বিতর্ক নয়; এটি প্রতিরোধ-নীতির প্রশ্ন।
ন্যাটোর ইতিহাস বুঝলে বর্তমান সংকট আরও স্পষ্ট হয়
ন্যাটো কেন সৃষ্টি হয়েছিল, তা বুঝতে পারলে ট্রাম্পের বক্তব্যের ওজনও ভালোভাবে বোঝা যায়।
অনেকে মনে করেন, কেবল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য হুমকির কারণে ন্যাটোর জন্ম। কিন্তু ন্যাটোর নিজস্ব সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অনুযায়ী, বিষয়টি আংশিক সত্য। বাস্তবে জোটটি গড়ে তোলা হয়েছিল তিনটি বড় প্রয়োজন থেকে:
প্রথমত, সোভিয়েত সম্প্রসারণবাদ ঠেকানো;
দ্বিতীয়ত, উত্তর আমেরিকার সহায়তায় ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান রোধ করা;
তৃতীয়ত, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যকে শক্তিশালী করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সেই যুদ্ধে অন্তত ৩ কোটি ৬৫ লাখ মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ১ কোটি ৯০ লাখ ছিলেন বেসামরিক। এই বিপর্যয় শুধু জনসংখ্যা নয়, রাষ্ট্রের স্থিতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসও ভেঙে দিয়েছিল। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত-ঘেঁষা কমিউনিস্ট প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। ১৯৪৮ সালে গোপনে সোভিয়েতের সাহায্য নিয়ে চেকোস্লোভাকিয়া কমিউনিস্ট পার্টি দেশটির গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করে।

এই পটভূমিতে ১৯৪৮ সালে পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশ “ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন” গঠন করে। পরে দীর্ঘ আলোচনা-বিতর্কের পর ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল সই হয় নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি। শুরুতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১২ দেশ ন্যাটোয় যোগ দেয়। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৩২।
ন্যাটোর সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো আর্টিকেল ফাইভ—যেখানে বলা হয়, কোনো এক সদস্য বা একাধিক সদস্যের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখায়, ন্যাটো কেবল একটি সামরিক চুক্তি নয়; এটি ইউরোপীয় ভাঙন ঠেকানোর প্রকল্প, আমেরিকান কৌশলগত উপস্থিতির স্থাপনা, এবং পশ্চিমা রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি এই জোটকে “গুরুত্বহীন” বলতে শুরু করেন, তাহলে তা নিছক ভাষাগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব বনাম রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা
ট্রাম্পের ন্যাটো-বিরোধী অবস্থানকে বুঝতে হলে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রটিও মাথায় রাখতে হবে। তিনি নিয়মিতভাবে এমন একটি ভাষা ব্যবহার করেন, যা প্রচলিত কূটনৈতিক ভদ্রতার বাইরে গিয়ে আলোচনাকে নিজের সুবিধামতো নতুন ফ্রেমে নিয়ে আসে। ন্যাটো নিয়ে তাঁর ভাষাও সে রকম—সরাসরি, সংঘর্ষমুখী, এবং চাপ সৃষ্টিকারী।
সম্ভবত তিনি তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে চাইছেন।
প্রথমত, ঘরোয়া রাজনীতিতে তিনি দেখাতে চান যে তিনি “আমেরিকার স্বার্থ” আগে রাখছেন।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষা-দায়িত্ব বাড়ানোর চাপ দিচ্ছেন।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন।
কিন্তু এখানেই দ্বন্দ্ব। ট্রাম্পের কৌশল রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তা অস্থিতিশীল। কারণ জোটের শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আস্থার ওপর। মিত্ররা যদি মনে করে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্তিনির্ভর ও অস্থির, তাহলে প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।

তাহলে সামনে কী?
সোজা উত্তর হলো: বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প এককভাবে এই ৭৭ বছরের পুরোনো জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। আদালত, কংগ্রেস, সিনেট—সব মিলিয়ে তাঁর সামনে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, তিনি বারবার দেখিয়েছেন—প্রথাগত সীমারেখা ভেঙে এগোতে তিনি দ্বিধা করেন না।
তাই সামনে তিনটি সম্ভাবনা দেখা যায়।
এক. তিনি সরাসরি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যা বড় সাংবিধানিক সংঘাতে রূপ নেবে।
দুই. আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে থেকেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ, প্রতিশ্রুতি ও সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারেন।
তিন. শেষ পর্যন্ত এটি পূর্ণ বিচ্ছেদ নয়, বরং ইউরোপকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করার দর-কষাকষির ভাষা হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
ট্রাম্পের ন্যাটো-বিরোধী ভাষ্যকে শুধু “আরেকটি ট্রাম্পীয় নাটক” মনে করলে ভুল হবে। কারণ তাঁর বক্তব্যের ভেতরে আমেরিকার বৈশ্বিক ভূমিকা, ইউরোপের নিরাপত্তা, রাশিয়া-চীনকে ঘিরে শক্তির ভারসাম্য, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা জোটব্যবস্থার ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে।
আইন বলে, তিনি একক সিদ্ধান্তে সহজে ন্যাটো ছাড়তে পারবেন না। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি বলে, প্রেসিডেন্ট চাইলে জোটকে দুর্বল করার মতো বহু পদক্ষেপ নিতে পারেন। আর সেখানেই আসল উদ্বেগ।
সবচেয়ে বড় কথা, ন্যাটো প্রশ্নে ট্রাম্প যা করছেন, তা শুধু একটি জোটের ভেতরের বিরোধ নয়; এটি আজকের বিশ্বের কাছে একটি বড় পরীক্ষাও—মিত্রতা কি এখনো কৌশলগত শক্তি, নাকি তা কেবল সুবিধা-অসুবিধার অঙ্কে আটকে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো ভবিষ্যতের কাছেই জমা আছে।

