মঙ্গলবার রাতটা ছিল এমন এক রাত, যখন শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরান নয়, কার্যত পুরো বিশ্ব ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সময়সীমা দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, উত্তেজনা বাড়ছিল প্রতি মুহূর্তে, আর সেই চাপের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা দেন—ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টি যেন খুব সরল: কঠোর হুমকি, চাপের রাজনীতি, তারপর সমঝোতা। কিন্তু বাস্তবে এই ঘটনার ভেতর ছিল বহুস্তরীয় কূটনীতি, অবিশ্বাস, আঞ্চলিক শক্তির হিসাব এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভয়।
এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে ছিল হরমুজ প্রণালি—বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে সংবেদনশীল জলপথগুলোর একটি। ট্রাম্প জানিয়ে দেন, মঙ্গলবার 8pm ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম (1am ব্রিটিশ সামার টাইম)-এর মধ্যে যদি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান এই প্রণালি “সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক এবং নিরাপদভাবে” খুলে না দেয়, তাহলে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। পরে তিনি বলেন, ইরান যদি এই শর্তে রাজি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য বোমাবর্ষণ ও হামলা স্থগিত করবে। সংখ্যার দিক থেকে এটি ছোট সময়সীমা মনে হতে পারে, কিন্তু ভূরাজনীতির বিচারে এটি ছিল এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সাময়িক থামা।
তবে এটাকে শুধু “ট্রাম্পের চাপ কাজ করেছে” বলে ব্যাখ্যা করলে আসল ছবিটা বোঝা যাবে না। কারণ একই দিনের সকালেই, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছিলেন—ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা “খুবই গুরুতর” হলেও তিনি নিশ্চিত নন যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না। অর্থাৎ প্রকাশ্যে তিনি যতটা দৃঢ় দেখাচ্ছিলেন, ভেতরে ততটাই অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। এই দ্বৈততা পুরো সংকটের মূল চরিত্র: সামনে কড়া ভাষা, ভেতরে সমাধান খোঁজার তীব্র চেষ্টা।
এই জায়গাতেই কূটনৈতিক নাটকের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। বিশ্ব যখন সম্ভাব্য বড় সংঘাতের আশঙ্কায় কাঁপছে, তখন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার নেপথ্যে সমাধানের পথ খুঁজছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিকদের সঙ্গে মিলে তারা একটি গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরির চেষ্টা করছিলেন। একইসঙ্গে উইটকফের নাকি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি-সহ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আলাদা একটি চ্যানেলও ছিল। অর্থাৎ প্রকাশ্যে যতই ভাষা কঠোর হোক, আসল লড়াই তখন হচ্ছিল বার্তা, খসড়া এবং গোপন যোগাযোগের স্তরে।
এখানে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মিশর, পাকিস্তান ও তুরস্ক গত দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান করছিল—এমনটাই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কারণ সবাই বুঝছিল, যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধই থেকে যায়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খাবে। জ্বালানির দাম বেড়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে, আর সেই অভিঘাত বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়াতে পারে। যুদ্ধের মানবিক ক্ষতি তো ছিলই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা। ফলে এই যুদ্ধবিরতি কেবল সামরিক উত্তেজনা থামানোর চেষ্টা ছিল না, বরং বিশ্ববাজারকে স্থিতিশীল রাখারও এক মরিয়া প্রয়াস ছিল।
তবে সমঝোতা সহজে আসেনি। সোমবার ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তাদের বক্তব্য ছিল পরিষ্কার: শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, তারা এমন নিশ্চয়তা চায় যাতে ভবিষ্যতে আবার হামলার শিকার না হতে হয়। এই অবিশ্বাসের পেছনেও ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি-তে আলোচনা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছিল, আর সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে তেহরান, বিশেষ করে কুশনার ও উইটকফের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। অর্থাৎ সমস্যা শুধু শর্তে ছিল না, সমস্যা ছিল বিশ্বাসের ঘাটতিতেও।
এরপর ইরান যুদ্ধের অবসান টানতে একটি ১০ দফা পরিকল্পনা দেয়। সেখানে ছিল—অঞ্চলে সংঘাতের ইতি, প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের প্রোটোকল, পুনর্গঠন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়। পাকিস্তান এই প্রস্তাব ট্রাম্পের আলোচক দলের কাছে পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের চোখে সেই প্রস্তাব ছিল “গুরুত্বপূর্ণ”, কিন্তু যথেষ্ট নয়। তবু হোয়াইট হাউসের ভেতরে এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছিল, কারণ অন্তত ইরান আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। কূটনীতিতে প্রায়ই প্রথম সাফল্য চুক্তি নয়; প্রথম সাফল্য হলো, পক্ষগুলো টেবিল ছেড়ে উঠে না যাওয়া।
এই পর্যায়ে পাকিস্তান শুধু বার্তাবাহক ছিল না, বরং খসড়া সংশোধন, প্রস্তাবের ভাষা নরম করা এবং গ্রহণযোগ্য রূপরেখা দাঁড় করানোর কাজেও জড়িয়ে পড়ে। শেহবাজ শরিফ মঙ্গলবার রাতে এক্স-এ পোস্ট করে বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা “steadily” এগোচ্ছে, এবং তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বানও জানান। আরও কৌতূহলজনক বিষয় হলো, পোস্টটির সম্পাদনা-ইতিহাসে নাকি প্রথম খসড়াকে “Pakistan’s PM Message on X” নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল—যা দেখে সন্দেহ তৈরি হয়, সম্ভবত অন্য কোনো পক্ষ, হয়তো যুক্তরাষ্ট্র, বার্তাটি লিখে ইসলামাবাদে পাঠিয়ে থাকতে পারে। এটি নিশ্চিত প্রমাণ নয়, কিন্তু ঘটনাটির নেপথ্য সমন্বয় কতটা সূক্ষ্ম ছিল, তা স্পষ্ট করে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির-এর নামও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুই দিকেই তার যোগাযোগ থাকায় তাকে সবচেয়ে কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তিনি নাকি 2025 সালে ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার সাক্ষাৎও করেছিলেন। একইসঙ্গে তার সঙ্গে ইরানিয়ান রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থান তাকে এমন এক বিরল জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষই অন্তত তার কথাকে গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত ছিল। শেষ মুহূর্তের সমঝোতায় এমন মধ্যস্থতাকারীর গুরুত্ব অনেক সময় প্রকাশ্য নেতাদের চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে।
এখানে চীনের ভূমিকাও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ মুহূর্তে বেইজিং ইরানের ওপর চাপ দেয় পাকিস্তান-উপস্থাপিত যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিতে। চীনের আগ্রহের জায়গা খুব পরিষ্কার: হরমুজ প্রণালি খোলা থাকা মানে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতি থাকা, আর সেটি বিশ্ববাজার ও বাণিজ্যের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আগে তারা প্রণালি পুনরায় খোলার প্রশ্নে খুব সক্রিয় না থাকলেও, শেষ দিকে আলোচনায় জড়ানো দেখায়—যখন সংকট জ্বালানি বাণিজ্যকে নাড়িয়ে দেয়, তখন ভূরাজনীতি খুব দ্রুত বহুপাক্ষিক হয়ে ওঠে।
এর মধ্যে সামরিক বার্তাও থেমে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপে হামলা চালায়—যে দ্বীপ ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত, কারণ সেখান দিয়ে দেশটির 90 per cent তেল রপ্তানি পরিচালিত হয়। অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানের রেলসেতুতে হামলা চালিয়ে অন্তত দুইজনকে হত্যা করে। অর্থাৎ কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে তখনও বিস্ফোরণ, বারুদের গন্ধ এবং শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি চলছিল সমান তালে। এটাই এই সংকটের ভয়ংকর দিক—আলোচনার টেবিল আর যুদ্ধক্ষেত্র পাশাপাশি সক্রিয় ছিল।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় 20 per cent এই পথ দিয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন নাকি এর আগে এই জলপথকে প্রকাশ্যে তাদের মিশনের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরতে সতর্ক ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে, আর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তখন কমছিল। এই অবস্থায় হরমুজ প্রশ্নে নিষ্ক্রিয় দেখা যাওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা শুধু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপই ছিল না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চাল ছিল। তিনি হয়তো পুরো সংকটের সমাধান আনতে পারেননি, কিন্তু অন্তত এমন একটি চিত্র তৈরি করতে পেরেছিলেন যে তিনিই শেষ মুহূর্তে বিপর্যয় ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
দিন যত গড়িয়েছে, হোয়াইট হাউসের ভেতরের পরিবেশও বদলেছে। শুরুতে প্রশ্ন ছিল—সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না। পরে প্রশ্ন দাঁড়ায়—রাত আটটার আগে সেটা সম্ভব কি না। একই সময়ে জেডি ভ্যান্স বুদাপেস্টে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে এবং খুব শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল: সিদ্ধান্ত এখন ইরানের হাতে। অন্যদিকে বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ—অনেকেই ট্রাম্পকে পিছু হটার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। এর মানে দাঁড়ায়, এই সংকট তখন শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক লড়াই ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক জনমত, বাজার, নির্বাচনী হিসাব এবং ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ইমেজ—সবকিছুর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল।
অবশেষে সময়সীমা শেষ হওয়ার তিন ঘণ্টা আগে, ইরান জানায় তারা পাকিস্তানের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করছে। এরপর আসে সেই বহুল আলোচিত ঘোষণা। এখন প্রশ্ন হলো, এতে কি সত্যিই ট্রাম্প জিতলেন? নাকি তিনি অন্তত জয়ের চেহারাটা ধরে রাখতে পারলেন? বাস্তব উত্তর সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। তিনি একদিকে যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দেখাতে পারলেন, অন্যদিকে ইরানও এমন অবস্থান নিল যাতে আত্মসমর্পণের ছবি তৈরি না হয়। আর পাকিস্তান নিজেকে এমন এক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরল, যে সংকটের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ করেই অমূল্য হয়ে উঠতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে: এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই টিকবে? হরমুজ প্রণালি কি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকবে? আর যে অবিশ্বাস, প্রতিশোধ, শক্তির প্রদর্শন এবং নির্বাচনী রাজনীতির মিশ্রণ এই সংকটকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, তা কি শুধু সময় কিনে সামলানো সম্ভব? আপাতত বলা যায়, যুদ্ধ শেষ হয়নি—বরং সাময়িকভাবে থেমে থাকা একটি সংঘাত নিজের পরবর্তী অধ্যায়ের আগে বিরতি নিয়েছে। ইতিহাস অনেক সময় এমনভাবেই মোড় নেয়: শেষ মুহূর্তের সমঝোতা দিয়ে, কিন্তু অসমাপ্ত উত্তেজনা রেখে।
চাইলে এখন আমি এটাকে আরও একবার ঘষেমেজে একদম ব্লগে পোস্ট দেওয়ার মতো চূড়ান্ত সংস্করণ করে দিতে পারি, যেখানে ভাষা আরও মসৃণ, আরও আবেগঘন এবং পুরোপুরি প্রকাশযোগ্য থাকবে।

