যুদ্ধ থামানোর আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কেবল যুদ্ধবিরতি হলেই সবকিছু মিটে যাবে না। কারণ, সাময়িক গোলাবিরতির বাইরে গিয়ে এখন তেহরান যে ১০ দফা প্রস্তাব সামনে এনেছে, তা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত দরকষাকষির ভিত্তি তৈরি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিষয়টিকে ‘আলোচনার কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে ইঙ্গিত করেছিলেন, বুধবার ইরান সেটির রূপরেখা প্রকাশ করলেও বাস্তবে এতে এমন কিছু দাবি রাখা হয়েছে, যেগুলো সহজে ওয়াশিংটন মেনে নেবে—এমনটা ভাবা কঠিন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যেসব শর্ত সামনে এনেছে, সেগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের আগের অবস্থানের তেমন মিল নেই। অর্থাৎ, বাইরে থেকে এটিকে আলোচনার সূচনা মনে হলেও ভেতরে ভেতরে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান এখনো যথেষ্ট বড়। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঠিক পরদিন সকালে ইরান যে প্রস্তাব প্রকাশ করল, তাতে স্পষ্ট—তেহরান শুধু সংঘাত থামাতে চায় না, বরং এই যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় নিজের কৌশলগত অবস্থানও শক্ত করতে চাইছে।
ইরানের প্রস্তাবের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি। শুধু তাই নয়, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব পুনর্নিশ্চিত করতে চায় তেহরান। সঙ্গে আছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখার প্রশ্ন। এ তিনটি দাবিই এমন, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জ্বালানি রাজনীতি ও পারমাণবিক নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে। ফলে আলোচনা শুরুর আগেই বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ সমঝোতার পথে বাধা কম নয়।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের এই দাবির অনেকগুলোই গত মাসে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও ওই মার্কিন প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। এর আগের আলাপ-আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্রের জোর ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধের ওপর। সে জায়গা থেকে ইরানের বর্তমান অবস্থানকে দেখা যায় এক ধরনের পাল্টা কূটনৈতিক চাপ হিসেবে।
ইরানের প্রথম বড় দাবি হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তারা আর আগ্রাসন চালাবে না। এই দাবির ভেতরে শুধু যুদ্ধবিরতির আহ্বান নেই; আছে একটি স্থায়ী, আনুষ্ঠানিক ও রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত সমাপ্তির প্রত্যাশা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি। কারণ, তারা মনে করছে শুধু কয়েক দিনের বিরতি নয়, সংঘাতের চরিত্রই পাল্টাতে হবে। অর্থাৎ, তেহরান একদিকে যুদ্ধ থামাতে চাইছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ হামলার আশঙ্কা কমানোর মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত কাঠামোও চাইছে।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। তাই এই প্রণালি কেবল একটি সামুদ্রিক করিডর নয়, বিশ্ব অর্থনীতির স্পন্দনও অনেকটাই এর ওপর নির্ভরশীল। ইরান যদি এখানে নিজের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে চুক্তির কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তাহলে সেটা শুধু আমেরিকার জন্য নয়, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে। কারণ, হরমুজে অনিশ্চয়তা মানেই জ্বালানি বাজারে চাপ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধাক্কা, আর বিশ্বরাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ। এই জায়গাটিই সম্ভবত চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় জট তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, ইরান আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসানের কথা বলছে—যার মধ্যে লেবাননে তাদের মিত্র হিজবুল্লাহ-সংক্রান্ত ফ্রন্টও রয়েছে। কিন্তু এই দাবির মধ্যেও রয়েছে জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চায়, তেহরান তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করুক। বর্তমান সংঘাতে এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল বলছে লেবাননে তাদের অভিযান বর্তমান যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না। ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক শান্তিচুক্তি আদৌ সম্ভব কি না, সেটি এখনো খোলা প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
চতুর্থ দাবি—মধ্যপ্রাচ্যের সব ঘাঁটি ও অবস্থান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। বাস্তবতা হচ্ছে, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরাকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজেই এ দাবি মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। এই প্রস্তাবকে তাই কেউ কেউ বাস্তবসম্মত দরকষাকষি নয়, বরং সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে আলোচনা শুরু করার কৌশল বলেও দেখছেন।
ইরানের পঞ্চম বড় শর্ত ক্ষতিপূরণ। চলমান যুদ্ধে দেশটি যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধ কারখানা, ইস্পাত কারখানা, সেতু, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্বালানি অবকাঠামো—সব মিলিয়ে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। তেহরান সেই ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ চাইছে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে এই দাবিও আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম। তবু ইরানের অবস্থান বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা বোঝাতে চাইছে—যুদ্ধের মূল্য শুধু নিরাপত্তা দিয়ে নয়, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দিয়েও মাপা হবে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর একটি হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান ছিল—ইরানকে সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। বিপরীতে তেহরান বলছে, এই অধিকার তারা ছাড়বে না। এখানেই পারমাণবিক আলোচনার মূল স্নায়ুযুদ্ধ। কিছু আঞ্চলিক কূটনীতিক নাকি আমেরিকার অবস্থান কিছুটা নমনীয় করার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা, ইরান যদি খুব সামান্য বা নামমাত্র মাত্রায়, শুধুমাত্র বেসামরিক কাজের জন্য সমৃদ্ধকরণে রাজি হয়, তাহলে হয়তো একটি মাঝামাঝি পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু ওয়াশিংটন এতে সম্মত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
এরপর আসে নিষেধাজ্ঞার প্রশ্ন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরানের ওপর আমেরিকার নানা প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ফলে দেশটির আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরেই চাপে আছে। ইরান এখন শুধু সরাসরি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলছে না, বরং সেইসব পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞাও বাতিল করতে চাইছে, যেগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশ বা বিদেশি কোম্পানিকেও ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে শাস্তির মুখে ফেলে। আগের আলোচনায় দেখা গেছে, পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দিলে বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্পও গত বুধবার শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা কমানোর আভাস দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর বিনিময়ে আমেরিকা ঠিক কতটা কূটনৈতিক বা কৌশলগত লাভ দেখতে চাইবে?
ইরানের আরেকটি বড় দাবি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাদের বিরুদ্ধে থাকা প্রস্তাবগুলো বাতিল করা। গত জুনে ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেখানে বলা হয়, ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে না। তেহরান এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক চাল বলে নিন্দা জানায়। একইভাবে গত অক্টোবর মাসে জাতিসংঘও ইরানের বিরুদ্ধে আবার নিষেধাজ্ঞা দেয়, কারণ ২০১৫ সালের পারমাণবিক সমঝোতার সীমা তারা মানছে না বলে অভিযোগ ওঠে। বাস্তবতা হলো, আমেরিকা চাইলেই এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। তবে বড় কোনো সমঝোতা হলে মিত্রদের রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারে। এ কারণেই ইরানের এই দাবিগুলোকে অনেকে বাস্তব চুক্তির চেয়ে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।
এখন মূল প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এই ১০ দফা প্রস্তাবের কোনো অংশ মেনে নেবে? বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাবনা খুব কম। কারণ, প্রায় এক বছর আগে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট ছিল, দুই পক্ষের দাবি-দাওয়ার ফারাক বিশাল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অগ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফিও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার ভাষায়, এমন কোনো চুক্তি যদি ইরানকে হরমুজ নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়, তাহলে তা বিশ্বের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, আমেরিকার রাজনৈতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যও বেশ কঠোর। যুদ্ধ থামানোর চুক্তির পাশাপাশি তিনি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সময় দিয়েছিলেন। সময়সীমা না মানলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের হুমকি পর্যন্ত দেন তিনি। আবার যুদ্ধবিরতির পর গতকাল বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তেহরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া ‘চুক্তি’ পুরোপুরি না মানে, তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করবে। আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ, উড়োজাহাজ, সামরিক সদস্য, অতিরিক্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ইরানের ভেতরে ও আশপাশে অবস্থান করবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই ভাষা কোনোভাবেই নমনীয় কূটনীতির ভাষা নয়; বরং এটি চাপ সৃষ্টি করে দরকষাকষির পরিসর সংকুচিত করার কৌশলও হতে পারে।
ইসরায়েল এই সমীকরণের বাইরে নেই। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার মার্কিন সিদ্ধান্তকে তারা সমর্থন করে। তবে একই সঙ্গে তারা জানিয়ে দিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন নেই। এখানেই নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, এই যুদ্ধবিরতি ‘লেবাননসহ সব স্থানের’ জন্য প্রযোজ্য। দুই পক্ষের এই ভিন্ন ব্যাখ্যা দেখাচ্ছে যে, এক ঘোষণার মধ্যেও একাধিক বাস্তবতা কাজ করছে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও মাটির বাস্তবতায় সংঘাতের বিভিন্ন ফ্রন্ট খোলা থেকেই যেতে পারে।
লেবাননের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করার পর লেবাননও বড় সংঘাতের অংশ হয়ে পড়ে। সবশেষ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার খবর এসেছে। ইসরায়েল বলছে তারা হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেছে, কিন্তু লেবাননের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন বহু বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছেন। এই বাস্তবতা দেখায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা হলেও আঞ্চলিক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সহজে ঠান্ডা নাও হতে পারে।
এরপর কী হতে পারে—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, তিনি আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে বৈঠকের জন্য ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তেহরান আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা বললেও হোয়াইট হাউস এখনো সরাসরি বৈঠকের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। আবার লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকার পর ইরান বুধবার জানিয়ে দিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনা এগোনো ‘অযৌক্তিক’। অর্থাৎ, আলোচনা টেবিল যেমন খোলা আছে, তেমনি তা ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও প্রবল।
সব মিলিয়ে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে শুধু শান্তির রূপরেখা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে চাপ, অবস্থান, বার্তা এবং কৌশলের দলিল। তেহরান বোঝাতে চাইছে, তারা কেবল যুদ্ধবিরতি চায় না; চায় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভূমিকা, অর্থনৈতিক স্বস্তি ও পারমাণবিক অধিকার—সবকিছুকে একসঙ্গে ধরে রেখে নতুন সমীকরণ। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করতে, কিন্তু নিজেদের কৌশলগত প্রভাব কমাতে নয়। এখানেই দুই পক্ষের সংঘাতের মূল সুর।
সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব পুরোপুরি মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে এটাও সত্য যে, ভবিষ্যৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন এই প্রস্তাবই। শেষ পর্যন্ত হয়তো সব শর্ত মানা হবে না, কিন্তু কোন দাবিগুলো দরকষাকষির মাধ্যমে নরম হবে আর কোনগুলো কঠোর অবস্থান হিসেবে টিকে থাকবে—সেটাই ঠিক করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী রাজনৈতিক মানচিত্র।

