যুদ্ধবিরতির নড়বড়ে আবহে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামরিক নয়, অর্থনৈতিক—ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আসলে কতটা হারাল? এর উত্তর এক লাইনে দেওয়া যায় না। কারণ এই যুদ্ধের ক্ষতি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান বা গোলাবারুদের খরচে আটকে নেই; এর সঙ্গে জুড়ে গেছে অর্থনীতির স্থবিরতা, সরবরাহব্যবস্থার ধাক্কা, ভাণ্ডার পুনরায় ভরার ব্যয়, এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যয়ের নতুন চাপ।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয় সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে বড় আকারে বেড়েছে। কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের হিসাব বলছে, যুদ্ধের প্রথম ৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, আর ১২ দিনে তা বেড়ে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হয়। এর অর্থ হলো, যুদ্ধের একেবারে শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ব্যয়ের ঘূর্ণিতে ঢুকে পড়ে, যেখান থেকে বের হওয়া সহজ নয়।
এরপর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রটি আরও ভারী হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ ষষ্ঠ সপ্তাহে পৌঁছানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হারে বাড়ছিল এবং মোট ব্যয় ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ব্যয় মেটাতে এবং ক্ষয় হওয়া অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় গড়ে তুলতে হোয়াইট হাউস ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত তহবিল চাওয়ার কথা বিবেচনা করছিল। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ শুধু চলতি অভিযান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপরও বড় চাপ তৈরি করেছে।
সংখ্যাগুলো খেয়াল করলে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কেবল “যুদ্ধে ব্যয়” নয়, বরং “যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয়”। হাজারের বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিরোধক, শত শত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, বিপুল নৌ ও বিমান মোতায়েন—এসবের মানে হলো আজকের যুদ্ধের বিল আগামী দিনের সামরিক প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনলেও তেলের বাজার, জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ছবিটি আরও জটিল। কারণ দেশটি এখনো যুদ্ধজনিত মোট ক্ষতির একটি একক, চূড়ান্ত অঙ্ক প্রকাশ করেনি। তবে যে তথ্যগুলো প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলো বলছে—ক্ষতি শুধু প্রতিরক্ষা খাতে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। মার্চের শুরুতেই ইসরায়েল সরকার ৯ বিলিয়ন শেকেল অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন করে। একই সময়ে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানায়, কঠোর যুদ্ধকালীন বিধিনিষেধ বহাল থাকলে অর্থনীতির ক্ষতি সপ্তাহে ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই ক্ষতির ভেতরে রয়েছে বহু স্তর। কর্মস্থলে যাতায়াত সীমিত হওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, রিজার্ভ বাহিনী ডাকা, কারখানা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে বাধা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা ও ব্যবসার ক্ষতিপূরণ—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের যুদ্ধের খরচ এক ধরনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক অভিঘাতে পরিণত হয়েছে। তাই দেশটির ক্ষতি মাপতে শুধু সামরিক খরচের খাতা দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়ে না। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, এই চাপ তত গভীরভাবে সাধারণ অর্থনীতির ভেতর ঢুকে পড়ে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষতির প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র বেশি হারাচ্ছে বিশাল সামরিক যন্ত্র চালানো, জাহাজ-বিমান মোতায়েন, দূরপাল্লার হামলা এবং গোলাবারুদ পুনরায় ভরার খাতে। অন্যদিকে ইসরায়েল তুলনামূলক ছোট আকারের অর্থনীতির কারণে দ্রুত চাপ অনুভব করছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। সহজ ভাষায় বললে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি বড় অঙ্কের; ইসরায়েলের ক্ষতি বেশি তীব্রভাবে অনুভূত।
যুদ্ধবিরতির বর্তমান অবস্থা এই হিসাবকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ যুদ্ধ থেমে গেলেও তার বিল সঙ্গে সঙ্গে থামে না। তেলের দামে তাৎক্ষণিক পতন এবং বিশ্ববাজারে সাময়িক স্বস্তি দেখা গেলেও জ্বালানি, বীমা, নৌপথ ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষত অনেক সময় যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়—বিশেষ করে যখন একটি সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এত গুরুত্বপূর্ণ পথকে নাড়িয়ে দেয়।
সবকিছু মিলিয়ে আপাতত যে উপসংহার টানা যায়, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিত ব্যয় ইতোমধ্যে কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনরায় সজ্জা ব্যয়সহ তা আরও অনেক দূর যেতে পারে; আর ইসরায়েলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মোট অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত না হলেও দেশটির অর্থনীতি সপ্তাহে বহু বিলিয়ন শেকেলের ধাক্কা সামলাচ্ছে। তাই “কে বেশি হারাল” প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কোন খাতা খোলা হচ্ছে তার ওপর। সামরিক ব্যয়ের খাতায় যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই এগিয়ে; কিন্তু অর্থনীতির শিরায়-শিরায় চাপের খাতায় ইসরায়েলের ক্ষতিও কম নয়।
অতএব, ইরান-সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো সামরিক নয়, অর্থনৈতিক: আধুনিক যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের আগেই শুরু হয় সহনশীলতার পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—দু’পক্ষই বড় অঙ্কের মূল্য দিচ্ছে, শুধু ভিন্ন ভিন্ন খাতে

