ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি এসে পড়েছে ন্যাটো জোটের ভেতরকার সম্পর্কে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন, যাদের তিনি এই সংঘাতে যথেষ্ট সহায়ক বলে মনে করছেন না। প্রশাসনের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে—যেসব ন্যাটো সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাশিত সহায়তা দেয়নি, সেসব দেশ থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে অপেক্ষাকৃত অনুকূল দেশগুলোতে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে।
এখনও পর্যন্ত কোনো দেশের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে আলোচনায় কয়েকটি দেশের নাম ঘুরে ফিরেই আসছে। যুক্তরাজ্যের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ যুদ্ধ চলাকালেই প্রকাশ্যে আসে, কারণ ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা চালাতে দেওয়া হয়নি। স্পেনও সংঘাতের সময় মার্কিন বিমানকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি। অন্যদিকে, জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়াস যুক্তরাষ্ট্রের ইরান অভিযানকে “আমাদের যুদ্ধ নয়” বলে মন্তব্য করে ট্রাম্পের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেন।
হোয়াইট হাউসের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটি আরও জোর পেয়েছে। প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটোর সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত। এমনকি শুধু সেনা পুনর্বিন্যাস নয়, ন্যাটো থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অন্দরমহলে জল্পনা আরও বেড়ে যায়, যখন জানা যায় যে ট্রাম্প বুধবার ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার প্রশ্নও তুলেছেন।
বৈঠকের পর ট্রাম্প আবারও ন্যাটোর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনের সময় ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি, আর ভবিষ্যতেও দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি ন্যাটোকে আগের মতো নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে দেখছেন না। গত সপ্তাহেও তিনি এক সাক্ষাৎকারে ন্যাটোকে দুর্বল কাগুজে শক্তি বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট থেকে বের করে আনার প্রশ্ন এখন আর শুধু ভাবনার পর্যায়ে নেই, বরং তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
মার্ক রুটে অবশ্য পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া হিসেবে তুলে ধরতে চাননি। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি স্বীকার করেন, অনেক ন্যাটো মিত্রকে নিয়ে ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই হতাশ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাদের আলোচনা ছিল খুবই খোলামেলা। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ নানা উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে, বিশেষ করে মার্কিন বিমান ব্যবহারের জন্য সামরিক ঘাঁটি উন্মুক্ত করে দিয়ে। তার ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার বিষয়ে ন্যাটোর ভেতরে বিস্তৃত সমর্থন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এই মুহূর্তে এমন সামরিক সক্ষমতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই ছিল।
এই বৈঠকে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়টিও বড় জায়গা পায়। রুটে ট্রাম্পকে বলেন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য গ্রহণে চাপ দিয়ে তিনি এক বদলে দেওয়া উত্তরাধিকার তৈরি করেছেন। বহুদিন ধরেই ট্রাম্পের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র একাই নিরাপত্তা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করছে, আর অনেক মিত্র সেই নিরাপত্তার সুবিধা নিলেও সমান দায় নিচ্ছে না। এই ক্ষোভ তিনি অতীতেও বহুবার প্রকাশ করেছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিটও বুধবার ট্রাম্পের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেন। তার বক্তব্য ছিল, পরীক্ষার সময়ে ন্যাটো মিত্ররা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, গত ছয় সপ্তাহে তারা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, অথচ তাদের প্রতিরক্ষার পেছনে অর্থ জুগিয়েছে সেই আমেরিকানরাই। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার যে, ট্রাম্প প্রশাসন শুধু সামরিক সহায়তার অভাব দেখছে না, বরং এটিকে রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতাও হিসেবে তুলে ধরছে।
এই অবস্থার পেছনে ইরান যুদ্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প একদিন আগে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তবে তার শর্ত ছিল, ইরানকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে। এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, আর সেই চাপ ট্রাম্পকে নিজ দেশেও রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
বুধবারই মার্ক রুটে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেখানে ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয় আলোচনা হয়। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, বর্তমান সংকট শুধু একটি যুদ্ধ বা একটি বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো, পারস্পরিক আস্থা এবং দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে ট্রাম্প চাইলে সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করে নিতে পারবেন না। ২০২৩ সালের একটি আইন এতে বাধা দেয়, আর সেই আইনটির পক্ষে কাজ করেছিলেন মার্কো রুবিও, যখন তিনি ফ্লোরিডা থেকে সিনেটর ছিলেন। ওই আইন অনুযায়ী, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করতে পারেন না। তবু ট্রাম্প চাইলে এমন বার্তা দিতে পারেন যে, আক্রমণের মুখে পড়া কোনো মিত্রদেশকে যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করবে না। আর সেটিই হবে ন্যাটো জোটের মূল ভিত্তির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। কারণ এই জোটের শক্তি শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকারের মধ্যেই নিহিত।
ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের টানাপোড়েন আসলে নতুন কিছু নয়। বহুদিন ধরে তিনি বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোটে ঠকানো হয়েছে। তার অভিযোগ, অনেক সদস্য দেশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ করেনি, অথচ তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার নিচে নিরাপত্তা ভোগ করেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও তিনি বলেছিলেন, যেসব দেশ নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে রাশিয়া যা খুশি করুক—এমন অবস্থান নিতেও তিনি প্রস্তুত। এই ধরনের মন্তব্য আগেও জোটের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি করেছিল, আর এবার ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা আবারও সামনে চলে এসেছে।
তবে একটি দিক লক্ষণীয়—মার্ক রুটের কূটনৈতিক তৎপরতা আগে ট্রাম্পকে কিছুটা শান্ত করতে পেরেছিল বলেই মনে করা হতো। কারণ স্পেন ছাড়া ন্যাটোর প্রায় সব সদস্য দেশ মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের পর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেই সমঝোতাও এখন আর তার ক্ষোভ ঠেকাতে পারছে না। অর্থাৎ, তার কাছে বিষয়টি শুধু অর্থের নয়; বরং রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সংকটমুহূর্তে পাশে থাকারও।
ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর গত বছর থেকেই ন্যাটো একের পর এক চাপে পড়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি ছিল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার অবস্থান, যখন তিনি জোটভুক্ত ডেনমার্কের অধীন এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনার হুমকি দেন। সেই ঘটনার সময়ও বোঝা গিয়েছিল, ট্রাম্প ন্যাটোকে শুধু একটি সামরিক জোট হিসেবে দেখেন না; বরং এটিকে এমন এক সম্পর্ক হিসেবে দেখেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছাই প্রধান হওয়া উচিত। আর এখন ইরান যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তথাকথিত ‘অসহযোগী’ দেশগুলোকে শাস্তি দিতে সেনা সরিয়ে নিতে শুরু করে, বা আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে থেকেও বাস্তবে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দুর্বল করে ফেলে, তাহলে পুরো পশ্চিমা প্রতিরক্ষা কাঠামোতেই বড় ধাক্কা লাগতে পারে। ফলে ট্রাম্প ও রুটের এই বৈঠককে শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সাক্ষাৎ বলে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং এমন এক সতর্কবার্তা, যা বুঝিয়ে দিচ্ছে—ন্যাটো জোটের ভেতরে জমে থাকা টানাপোড়েন এখন আরও গভীর এবং আরও প্রকাশ্য।

