মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ শেষে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরেছেন চার নভোচারী। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সফল যাত্রার সমাপ্তিই নয়, বরং ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৭ মিনিটে নভোচারীদের বহনকারী ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। মহাকাশযানটি সমুদ্রে অবতরণ করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘স্প্ল্যাশ ডাউন’। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হওয়ায় শুরু থেকেই স্বস্তির বার্তা আসে উদ্ধারকারী দলের কাছ থেকে।
অবতরণের পর মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানান, চারজন নভোচারীই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তার ভাষায়, এটি ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, এবং পুরো দল শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অভিযানের পর স্বস্তি ফিরে আসে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে।
মহাকাশযান থেকে নভোচারীদের উদ্ধারের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল বিশেষ উদ্ধারকারী দল। সমুদ্রে অবতরণের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে ক্যাপসুলটি নিরাপদ করা হয়। এরপর নভোচারীদের একটি ভেলায় আনা হয়, যাকে ‘ফ্রন্ট পোর্চ’ বলা হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাদের মার্কিন নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘ইউএসএস জন পি মুরথা’-তে নেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় লাগে।
জাহাজে পৌঁছানোর পর নভোচারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর তাদের যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে অবস্থিত জনসন স্পেস সেন্টারে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে আরও বিস্তারিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ থাকবে।
এই মিশনটি ছিল প্রায় ১০ দিনের এক রোমাঞ্চকর যাত্রা, যা শুরু হয়েছিল ১ এপ্রিল। এতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। তাদের এই যাত্রা একাধিক দিক থেকে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
চাঁদের দূরবর্তী কক্ষপথে অবস্থানকালে পৃথিবী থেকে তাদের সর্বোচ্চ দূরত্ব ছিল ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৭ মাইল, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এই মিশনের মাধ্যমে ভিক্টর গ্লোভার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণের বিরল সম্মান অর্জন করেন।
অভিযানের সময় নভোচারীরা এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, যা খুব কম মানুষই কখনো প্রত্যক্ষ করতে পেরেছেন। চাঁদের কাছাকাছি অবস্থানকালে তারা অন্তত ছয়টি উজ্জ্বল উল্কাপাতের দৃশ্য সরাসরি দেখেছেন, যা এই যাত্রাকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।
আর্টেমিস-২ মিশনটি মূলত ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানের একটি পরীক্ষামূলক ধাপ। নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষ পাঠানোর যে পরিকল্পনা নিয়েছে, এই মিশন সেই লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ।

