৪০ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধ আপাতত থেমেছে, কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শান্ত নয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর আসছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই থেমেছে, নাকি এটি কেবল বিরতির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে?
যুদ্ধের ময়দানে কে জিতল আর কে হারল, সেই উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠছে দিন দিন: এই সংঘাতের মানবিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অত্যন্ত গভীর। আর সেই ক্ষতির পূর্ণ চিত্র সম্ভবত আরও পরিষ্কার হবে আজ থেকে পাকিস্তানে শুরু হওয়া সমঝোতা বৈঠকের পর।
ঘটনার শুরু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরু হয়। এরপর সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একে একে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা। দুই পক্ষই ছিল আক্রমণাত্মক, কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। সেই ঘোষণার পরই সামনে আসতে থাকে ক্ষয়ক্ষতির নানা হিসাব। যদিও যুদ্ধ চলাকালেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, এখন সেগুলো আরও বড় আকারে আলোচনায় এসেছে।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ধাক্কা যে ইরানকে সামলাতে হয়েছে, তা বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যেই স্পষ্ট। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে। ইরানের ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানির উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানায়, গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫৪ জন শিশু রয়েছে। এই সংখ্যা শুধু প্রাণহানির হিসাবই নয়, বরং যুদ্ধের মানবিক মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারও নির্মম প্রমাণ।
প্রাণহানির তালিকায় শুধু সাধারণ মানুষই নয়, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। যুদ্ধে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, শীর্ষ বিজ্ঞানী এবং সামরিক কর্মকর্তাদেরও প্রাণ গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এই সংঘাত ইরানের শুধু সাধারণ নিরাপত্তা কাঠামোকেই নয়, নেতৃত্ব এবং কৌশলগত সক্ষমতাকেও আঘাত করেছে।
কিন্তু ক্ষতি কেবল প্রাণহানিতেই থেমে নেই। বেসামরিক অবকাঠামোতে যে ধ্বংস নেমে এসেছে, তার পরিমাণও বিস্ময়কর। ইরানের রেডক্রস সোসাইটির প্রধান পিরহোসেন কোলিভান্ড জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ আবাসিক বাড়ি রয়েছে। অর্থাৎ, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, মানুষের ঘরবাড়ি, দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিক নিরাপত্তাকেও বিধ্বস্ত করেছে।
এছাড়া ২৩ হাজার ৫০০টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতও রক্ষা পায়নি। হামলায় ৩৩৯টি হাসপাতাল, ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এমন আঘাত দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে, কারণ এতে আহতদের চিকিৎসা যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
শিক্ষা খাতের অবস্থাও করুণ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৮৫৭টি স্কুল। অর্থাৎ, যুদ্ধের ক্ষত শুধু বর্তমান প্রজন্মের শরীরে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবনেও লেগে গেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও ইরানের অবস্থা ভয়াবহ। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট-এর বরাত দিয়ে আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, ইরানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা। এই অঙ্ক শুধু একটি দেশের যুদ্ধব্যয়ের হিসাব নয়; এটি শিল্প, ব্যবসা, অবকাঠামো, জনজীবন এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে আঘাতের প্রতিফলন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের চারটি প্রধান ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎপাদন কেন্দ্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি হামলা হয়েছে ২৯টি মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ৫টি জ্বালানি সংরক্ষণাগারে। অর্থাৎ, ইরানের সামরিক সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রতিরোধ কাঠামো—সবখানেই বড় ধাক্কা লেগেছে।
এই ধ্বংসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে কর্মসংস্থানেও। বহু ইরানি চাকরি হারিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর ও ব্রিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে যুদ্ধের ক্ষতি এখন আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা পৌঁছে গেছে দেশের অর্থনীতি, যাতায়াত, বাণিজ্য এবং সাধারণ জীবনযাত্রার ভেতর পর্যন্ত।
অনেক সময় বড় শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, তারা যুদ্ধের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সহজে সামলে নিতে পারে। কিন্তু এই ৪০ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও কম ক্ষতির মুখে পড়েনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সাতটি চালকসহ যুদ্ধবিমান এবং ২০টির বেশি এয়ারক্র্যাফট হারিয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্ষতি শত্রুপক্ষের হামলায়, আবার কিছু নিজেদের ভুলেও হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলবশত ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ৩টি ম্যাকডোনেল ডগলাস এফ-১৫ ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়। প্রতিটি এফ-১৫ ই যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ৯৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, শুধু এই তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হওয়ার কারণেই ক্ষতি হয়েছে তিন হাজার ৩শ কোটি টাকার বেশি।
তারপর গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবে ইরানি হামলায় ধ্বংস হয় একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ই-৩ সেন্ট্রি আওয়াকস বিমান। এর দাম অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন হাজার ৬শ’ কোটি টাকার বেশি।
শুধু তাই নয়, গত এপ্রিল ইরানের আঘাতে আরও একটি এফ-১৫ ই এবং দুটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ধ্বংস হয়। গত ১৯ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই বিমান তৈরির ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ৪৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
আবার গত ৫ এপ্রিল ইরানে পাইলট উদ্ধার অভিযানে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হারায় দুটি লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান। প্রতিটি বিমানের মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র দুটি বিমানের ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও, একটি সামরিক ওয়েবসাইটের দাবি—ওইদিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০ টি এবং ইসরাইলের একটি বিমান ধ্বংস হয়।
ড্রোন ক্ষতির হিসাবও কম নয়। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ১৯ মার্চের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১২টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি সরাসরি গুলি করে নামিয়েছে ইরান। একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের দাম প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চারশ’ কোটি টাকা।
এছাড়া বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে নজরদারি চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন হারিয়ে যায়। এর দাম প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই হাজার চারশ’ কোটি টাকার বেশি।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও ড্রোন মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, এত বড় ক্ষতির চাপ সামলাতেই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
মানবিক ক্ষতির দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি অক্ষত নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলো হামলার শিকার হয়েছে। গত ২১ মার্চ এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ক্ষতির পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান, ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর অভিঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৩১ মার্চ আল জাজিরা জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, ইরানের একমাসের হামলায় আরব দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ ১৯৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, এই সংঘাত ছিল না কেবল দুই বা তিন দেশের লড়াই; বরং এটি আঞ্চলিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও মানবজীবনের ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বহু মানুষের প্রাণহানির খবরও পাওয়া গেছে। এমনকি যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।
গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও, তাতে পুরো পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেছে—এ কথা বলা যাচ্ছে না। কারণ যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ফলে এটিকে অনেকেই স্থায়ী সমাধান নয়, বরং সাময়িক বিরতি হিসেবে দেখছেন।
আজ থেকে পাকিস্তানে শুরু হওয়া সমঝোতা বৈঠক এ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈঠক থেকে বোঝা যেতে পারে, উত্তেজনা কমানোর বাস্তব কোনো পথ তৈরি হচ্ছে কি না। কারণ যুদ্ধ থামানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিপুল ধ্বংসের পর অঞ্চলটিকে কীভাবে আবার স্থিতিশীল করা হবে।
৪০ দিনের এই যুদ্ধের পর এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, কে বিজয়ী আর কে পরাজিত। কিন্তু একথা নিশ্চয়ই বলা যায়—এই সংঘাতে সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান হারিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ, ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, সামরিক স্থাপনা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রও হারিয়েছে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান, ড্রোন, সামরিক সক্ষমতা এবং সেনাসদস্য। আর পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বেড়েছে অনিশ্চয়তা, ক্ষয়ক্ষতি ও নিরাপত্তা সংকট।
যুদ্ধের মাঠে হয়তো এখন সাময়িক নীরবতা আছে, কিন্তু ধ্বংসের হিসাব এখনো শেষ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আরও পরিষ্কার হবে—এই ৪০ দিনের সংঘাত শুধু সামরিক লড়াই ছিল না, এটি ছিল মানবিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক ধস এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার এক ভয়ংকর অধ্যায়।

