ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভেতরে বহু বছর ধরেই এক ধরনের টানাপোড়েন কাজ করেছে। বাইরে থেকে দুই দেশকে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে হলেও, সব কৌশলগত প্রশ্নে তাদের অবস্থান এক ছিল না। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নে ওয়াশিংটনের ভেতরে বহু প্রশাসন সতর্ক ছিল। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই পুরোনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।
শুক্রবার ‘দ্য ব্রিফিং উইথ জেন পসাকি’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেরি দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একাধিক মার্কিন প্রশাসনের কাছে ইরানে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কেরির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজে এমন অনেক আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন, যেখানে নেতানিয়াহু সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু সেই প্রস্তাবে জর্জ ডব্লিউ. বুশ, বারাক ওবামা এবং জো বাইডেন—কেউই সম্মতি দেননি। কেরির দাবি, একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কারণ এটি শুধু একটি অতীত কূটনৈতিক কথোপকথনের গল্প নয়; বরং এটি বোঝায়, ইরান প্রশ্নে মার্কিন নীতিনির্ধারণের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব ছিল। একদিকে ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা-ভিত্তিক কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ছিল সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ, তেলের বাজারে অস্থিরতা, মিত্রদের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে হিসাব-নিকাশ।
কেরির মতে, নেতানিয়াহু শুধু সাধারণভাবে হামলার কথা বলেননি, তিনি এ নিয়ে একটি বিস্তারিত ‘চার দফা প্রস্তাব’ও দিয়েছিলেন। সেই প্রস্তাবে যুক্তি ছিল—ইরানে সামরিক আঘাত হানলে দেশটির নেতৃত্ব দুর্বল হবে, সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা বড় ধাক্কা খাবে। এ ধরনের ধারণা ইসরায়েলের নিরাপত্তা-চিন্তার সঙ্গে মিললেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসন তা একইভাবে দেখেনি। কারণ সরকার দুর্বল করা আর একটি স্থিতিশীল বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠা এক জিনিস নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শাসনব্যবস্থাকে আঘাত করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু তার পরে টেকসই রাজনৈতিক স্থিতি ফেরানো অনেক বেশি কঠিন।
কেরি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভেতরেও মতভেদ ছিল। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন একক কণ্ঠে কথা বলছিল না। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইঙ্গিত। কারণ বড় যুদ্ধ বা আক্রমণের সিদ্ধান্ত সাধারণত শুধু প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় হয় না; সেখানে গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সামরিক ঝুঁকি, পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, জ্বালানি বাজার, মিত্ররাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুর সমন্বিত হিসাব থাকে। সেই জায়গা থেকেই বোঝা যায়, কেন বুশ, ওবামা বা বাইডেন সরাসরি হামলার পক্ষে যাননি।
অন্যদিকে, ট্রাম্পকে কেন আলাদা বলা হচ্ছে—সেখানেও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত কূটনৈতিক ধারা থেকে আলাদা ছিল। তিনি চাপ প্রয়োগ, শক্তি প্রদর্শন এবং নাটকীয় সিদ্ধান্তের রাজনীতি বেশি পছন্দ করতেন। ফলে ইরান ইস্যুতে তার অবস্থানও তুলনামূলকভাবে বেশি সংঘর্ষমুখী ছিল—এমন ধারণা তার সমালোচকরা বরাবরই দিয়ে এসেছেন। কেরির বক্তব্য সেই আলোচনাকেই নতুন করে উসকে দিল।
এই বিতর্কের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অভিযান চালায়, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এই দাবি সত্য হলে সেটি শুধু একটি সামরিক হামলা নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা।
এর জবাবে ইরানও চুপ থাকেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের তাৎপর্য কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও। কারণ হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উত্তেজনা তৈরি মানে শুধু আঞ্চলিক অস্থিরতা নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ঝাঁকুনি।
এরপর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় বলে জানানো হয়েছে। ৪০ দিনের সংঘাতের পর হওয়া এই সমঝোতা আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির খবর হলেও, বাস্তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়; বরং পরবর্তী দর-কষাকষির জন্য সময় বের করে নেওয়া। সেই ধারাবাহিকতায় শনিবার, ১১ এপ্রিল, ইসলামাবাদে দুই দেশ স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন হলো: এই আলোচনা কি সত্যিই শান্তির পথ খুলবে, নাকি এটি কেবল যুদ্ধের গতি কমানোর একটি বিরতি? বাস্তবতা হচ্ছে, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিভুজে অবিশ্বাস এত গভীর যে একটি বৈঠকে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইসরায়েল চায় ইরানের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব কমুক। ইরান চায় তার প্রতিরোধ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকুক। যুক্তরাষ্ট্র চায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে থাকুক, কিন্তু নিজের প্রভাবও যেন কমে না যায়। এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করা খুব সহজ নয়।
কেরির বক্তব্য এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি দেখাতে চেয়েছেন—ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান আগের প্রেসিডেন্টদের থেকে আলাদা ছিল। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ইসরায়েলের চাপের গল্প নয়; এটি আমেরিকার ভেতরে ক্ষমতা, নীতি ও কৌশলের ভিন্নতার গল্পও। বুশ, ওবামা এবং বাইডেন হয়তো মনে করেছিলেন, সরাসরি হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করবে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই হিসাবটি ভিন্ন ছিল—অথবা অন্তত কেরি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন।
তবে এখানে আরেকটি দিকও মনে রাখা দরকার। সাবেক কর্মকর্তাদের মন্তব্য অনেক সময় রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটের মিশ্রণ হয়ে ওঠে। তাই কেরির বক্তব্য যতই আলোড়ন তুলুক, এটি মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি বড় বিতর্কের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত। তবু এটি স্পষ্ট করে যে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কখনও সরল ছিল না, এখনও নয়।

