যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর ইরানের বহু মানুষ ধীরে ধীরে আবার কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন। রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গ্র্যান্ড বাজারে আগের তুলনায় বেশি দোকান খোলা ছিল, এবং সেগুলোও দীর্ঘ সময় চালু ছিল। কিন্তু বাইরে থেকে স্বাভাবিকতার এই আভাস যতটা আশাব্যঞ্জক মনে হয়, বাজারের ভেতরের বাস্তবতা ততটাই কঠিন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকান খুলেছে ঠিকই, কিন্তু বেচাকেনা ফিরেনি; মানুষের হাতে অর্থ কম, অনিশ্চয়তা বেশি, আর সামনে কী আসছে তা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নন।
তেহরানের বাজারের সরু গলি, গুদাম, ওয়ার্কশপ আর পাইকারি বাণিজ্যের জটিল নেটওয়ার্কে শনিবার—যা সেখানে কর্মসপ্তাহের প্রথম দিন—কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। যুদ্ধবিরতি বুধবার রাতের পর কার্যকর হওয়ার পর এটি ছিল প্রথম পূর্ণ কর্মদিবসের মতো একটি পরিস্থিতি। ফলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে বাজার হয়তো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ভাষ্য বলছে, বাস্তব চিত্র অনেক বেশি হতাশাজনক। দোকান খোলা থাকলেই যে ক্রেতা ফিরবে, এমন নয়; বিশেষ করে যখন মানুষ যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, ইন্টারনেট অচলাবস্থা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে।
গ্র্যান্ড বাজারের ধাতব পণ্য, যন্ত্রপাতি এবং হালকা শিল্পসামগ্রীর এক বিক্রেতা পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন প্রায় “সম্পূর্ণ স্থবিরতা” হিসেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিনই পাইকারদের কাছ থেকে নতুন দামের তালিকা এসেছে, এবং কিছু পণ্যের দাম জানুয়ারির শেষ দিকের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি। সংখ্যাটি শুধু একটি মূল্যবৃদ্ধির তথ্য নয়; এটি দেখিয়ে দেয় যে যুদ্ধের ধাক্কা বাজারব্যবস্থাকে কত দ্রুত অস্থির করে তুলেছে। আরও বড় প্রশ্ন হলো, নতুন পণ্য কবে আসবে, আদৌ আসবে কি না, এলে কত দামে আসবে—এসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ বাজারের সংকট শুধু বর্তমান বিক্রিতে নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার গভীর স্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, জানুয়ারির দামও আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। কারণ, তখনও দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ, সহিংসতা, এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বাজারে ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, সেই সময়কার বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল এবং রাষ্ট্র ২০ দিনব্যাপী প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিল। ফলে বোঝা যায়, বর্তমান সংকটটি এককভাবে যুদ্ধের ফল নয়; বরং বহুস্তরীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের ওপর নতুন করে যুদ্ধের আঘাত এসে পড়েছে। ইরানের অর্থনীতি যেন আগেই দুর্বল ছিল, যুদ্ধ এসে সেই দুর্বলতাকে আরও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
এবারের সংঘাত শুরুর পর, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র আবারও প্রায় সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। এই পদক্ষেপ কেবল তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করেনি; এটি অসংখ্য পরিবারের উপার্জনের পথও বন্ধ করে দিয়েছে। আজকের অর্থনীতিতে ইন্টারনেট শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং কাজ, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষা, গ্রাহক-সেবা, বিপণন—সবকিছুর অবকাঠামো। ফলে বোমা পড়া শহরে টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় হারানোর নির্মম বাস্তবতা। যুদ্ধের সরাসরি ক্ষতি যেমন ধ্বংসস্তূপে দেখা যায়, তেমনি এর অদৃশ্য ক্ষতি দেখা যায় ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কারণে আয়হীন হয়ে পড়া মানুষের জীবনে।
তেহরানের এক তরুণী, যিনি অনলাইনে ইংরেজি পড়ান, এই বাস্তবতাকে খুব ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করছেন। তিনি আগে Google Meet ব্যবহার করে বিদেশি ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন। এখন তাকে বাধ্য হয়ে স্থানীয় রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হচ্ছে, যেগুলো মূলত সীমিত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে চলে। তার অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তা ও ডেটা এনক্রিপশনের দিক থেকে দুর্বল, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেবল ইরানি IP থেকে যুক্ত হওয়া সম্ভব। ফলে বিদেশে থাকা তার শিক্ষার্থীরা আর তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন না। অর্থাৎ ইন্টারনেট বন্ধ শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করেনি; এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক সংযোগ ছিন্ন করেছে, শিক্ষাক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং ব্যক্তিগত জীবিকা ভেঙে দিয়েছে।
এই তরুণীর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কর্তৃপক্ষ কেন ইন্টারনেটকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোর মতো জরুরি বলে বিবেচনা করছে না। এটি আসলে সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার এক বড় বিতর্ককে সামনে আনে: ডিজিটাল অবকাঠামো কি এখন বিলাসিতা, নাকি মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন? যুদ্ধের সময় বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা, হাসপাতাল—এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ইন্টারনেটও যে জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যতথ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাপ্রবাহ তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
গ্র্যান্ড বাজারের ওই বিক্রেতাও জানিয়েছেন, তাদের অনলাইন বিক্রি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। কারণ, গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে ওয়েবসাইটে পৌঁছাতে পারছেন না। আগের মতো সার্চ করে পণ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না; অনেক সময় শুধু আগের পরিচিতি বা স্থানীয় ব্রাউজারের সহায়তায় কেউ কেউ সাইটে ঢুকতে পারছেন। ডিজিটাল বিপণনের যুগে এটি কার্যত ব্যবসার শ্বাসরোধের সমান। কারণ দোকান খোলা থাকলেও গ্রাহকের সামনে পৌঁছাতে না পারলে ব্যবসা আর পূর্ণ অর্থে সক্রিয় থাকে না। বাজারের এই অবস্থা দেখায় যে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট এখন অফলাইন ও অনলাইন—দুই ক্ষেত্রেই সমান্তরালভাবে চলছে।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান-এর সরকার আগে কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সরকার জানিয়েছে, “নিরাপত্তাজনিত বিবেচনায়” এই সীমাবদ্ধতা আপাতত বহাল থাকবে। অন্যদিকে আইসিটি মন্ত্রী সাত্তার হাশেমি গত সপ্তাহে বলেছেন, কিছু ডিজিটাল ব্যবসাকে লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত সহায়তা দেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে ঋণ এবং উন্নত ইন্টারনেট সংযোগও থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দিয়ে কি লাখো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে বাঁচানো সম্ভব? যখন গ্রাহকরাই অনলাইনে নেই, তখন শুধু কিছু ব্যবসাকে অতিরিক্ত সংযোগ সুবিধা দিলেই তো বাজার সচল হবে না।
এছাড়া কয়েকটি টেলিকম প্রতিষ্ঠান “Internet Pro” নামে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে, যা আসলে স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে এমন একটি কাঠামো তৈরির আলোচনা ছিল, যেখানে ভিন্ন পেশা ও ভিন্ন শ্রেণির মানুষ ভিন্ন মানের সংযোগ পাবেন। এই ধারণা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি এক ধরনের ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি করতে পারে। কেউ যদি দ্রুত, উন্মুক্ত এবং তুলনামূলক নিরাপদ সংযোগ পায়, আর সাধারণ মানুষ সীমিত বা দুর্বল সংযোগে আটকে থাকে, তাহলে ডিজিটাল অর্থনীতিতেও শ্রেণিবিভাজন আরও গভীর হবে।
ইরানের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার দিকে তাকালে বোঝা যায়, পরিস্থিতি আরও কঠিন দিকে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার গভীর প্রভাব আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের প্রধান ইস্পাত কারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল প্রস্তুতকারক, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক, বিমানবন্দর, বেসামরিক বিমান, বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, সেতু, রেল নেটওয়ার্ক এবং তেল-গ্যাস স্থাপনা অকার্যকর করে দিয়েছে। এই তালিকা শুধু সামরিক সংঘাতের তীব্রতা বোঝায় না; এটি দেখায় যে হামলার লক্ষ্যবস্তু এমন সব খাত, যেগুলো একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
এমন ধ্বংসযজ্ঞের পরে পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল কাজ। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ আজই শেষ হলেও ইরানের পুনর্গঠনে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। অথচ যুদ্ধের আগেই দেশটি বড় ধরনের বাজেট সংকটে ছিল। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল, যেগুলো মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট সম্ভাবনা নেই, ফলে বিদেশি বিনিয়োগও সহজে আসবে না। অর্থাৎ ইরান এমন এক অর্থনৈতিক ফাঁদের মধ্যে আটকে আছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের প্রয়োজন বিশাল, কিন্তু সেই পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মূলধন ও আস্থার ঘাটতি প্রবল।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—সব পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি তুলে ধরছে এবং প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। একই সময়ে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে। কিন্তু আলোচনার টেবিলে সংলাপ যতই থাকুক, সামরিক বাস্তবতা ততটাই উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে এখন ৫০,০০০-এর বেশি মার্কিন সেনা রয়েছে, সঙ্গে বিমানবাহী রণতরি ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা। ওয়াশিংটন হুমকি দিয়েছে যে, প্রয়োজনে স্থল হামলাও চালানো হতে পারে, যাতে ইরানের তেল-গ্যাস স্থাপনা আরও ধ্বংস করা যায় এবং হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দেওয়া যায়। এই সামরিক উপস্থিতি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ যুদ্ধবিরতি এখানে টেকসই শান্তির সমার্থক নয়।
এখানেই ইরানের বর্তমান সংকটের একটি বড় বাস্তবতা ধরা পড়ে: এটি শুধু বাইরের চাপের গল্প নয়, আবার কেবল ভেতরের ব্যর্থতার গল্পও নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতির প্রায় সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় কুশাসন ও দুর্নীতি, নিষেধাজ্ঞা, এক বছরেরও কম সময়ে দুইটি বড় যুদ্ধ, এবং দুই মাসের বেশি সময়জুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকার যৌথ প্রভাবে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক দুর্দশা বহুমাত্রিক। কোনো একক কারণ দিয়ে এই বিপর্যয় বোঝা যায় না; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার সমস্যা, বৈদেশিক চাপ এবং সামরিক সংঘাতের মিলিত ফল।
এই চাপে শ্রমবাজারও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এড়িয়ে মাত্র কয়েক মাসের জন্য চুক্তি করছে। বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি—উভয় মাধ্যমের বহু সংবাদকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যখন প্রযুক্তি, শিল্প এবং মিডিয়া—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাত একসঙ্গে সংকুচিত হতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় অর্থনীতি শুধু মন্থর হচ্ছে না; এটি কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে এগোচ্ছে।
তেহরানের এক ভিডিও গেম সমালোচক ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার মতো অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ার পর্যায়ও পেরিয়ে গেছেন। জীবিকা টিকিয়ে রাখতে তিনি পেশাগত যন্ত্রপাতি ও ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু নিচু দামে বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা ইরানের ভোক্তা অর্থনীতির গভীর সংকোচনকে সামনে আনে। মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত থাকে, তখন তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও পিছিয়ে দেয়। ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ আরও কমে যায়, আর সংকট নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে থাকে।
তার মন্তব্য—“যুদ্ধ থাক বা না থাক, মনে হয় আমরা অনেক আগেই মরে গেছি”—আসলে কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়; এটি একটি প্রজন্মের মানসিক ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি। তিনি আরও বলেছেন, শুধু তাদের কণ্ঠস্বরই স্তব্ধ করা হয়নি, বরং মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও এখন লড়াই করতে হচ্ছে। এই কথাগুলো বোঝায়, অর্থনৈতিক সংকট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার ওপরও আঘাত হানে। যুদ্ধবিরতি তাই সামরিক অর্থে স্বস্তি এনে দিলেও মানুষের ভেতরের অনিরাপত্তা দূর করতে পারেনি।
সব মিলিয়ে, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে বাজার খুলছে, মানুষ কাজে ফিরছে, শহর ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করছে—যা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি, ইন্টারনেট অচলাবস্থা, অবকাঠামো ধ্বংস, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি এবং ছাঁটাইয়ের ঢেউ অর্থনীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে যুদ্ধবিরতি এখানে শান্তির চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং এটি গভীরতর সংকটের মাঝখানে সাময়িক নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ মাত্র।
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু বাজার খোলা রাখা নয়, বরং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কেবল অবকাঠামো বা উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, প্রত্যাশা এবং নিরাপত্তাবোধের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। যদি মানুষ মনে করে কাল আবার হামলা হতে পারে, ইন্টারনেট আবার কেটে দেওয়া হতে পারে, চাকরি আবার চলে যেতে পারে—তাহলে শুধু দোকান খুলে দিয়ে অর্থনীতি সচল করা সম্ভব নয়। সুতরাং আজকের ইরানকে বুঝতে হলে দেখতে হবে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে একটি সমাজ কীভাবে ধীরে ধীরে টিকে থাকার লড়াইকে দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করছে।

