যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে মূল্যস্ফীতি প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত ঘিরে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটাই বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রধান চালক।
মার্কিন শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২২ সালের পর এটিই সবচেয়ে বড় মাসিক বৃদ্ধি, যখন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৃদ্ধির মূল কারণ জ্বালানির দাম। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোলের দামে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ, যা ১৯৬৭ সালের পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি হিসেবে ধরা হচ্ছে। একই সময়ে ভারী তেলের দামও ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে। সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৯৩ ডলার, যেখানে জাতীয় গড় ৪ দশমিক ১৬ ডলার।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে জ্বালানির দামের এই ঊর্ধ্বগতির কারণে। এর পাশাপাশি বিমান ভাড়া ও পোশাকের দামও বেড়েছে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও পরিবহন ব্যয় ও সারের দাম বাড়ায় ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যে চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা একে জ্বালানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির পুনরাবির্ভাব হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এখনো পুরো অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব পড়েনি, তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। হরমুজ প্রণালি শুধু তেল পরিবহনের পথই নয়, বরং প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এটি চালু থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ অবস্থার প্রভাব পড়েছে ভোক্তা আস্থাতেও। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সূচকে দেখা গেছে, এ মাসে ভোক্তা আস্থা রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে এসেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কর ছাড়, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মূল্যস্ফীতি সাময়িক হলেও অতীত অভিজ্ঞতার কারণে নীতিনির্ধারকেরা এবার আরও সতর্ক অবস্থান নেবেন।

