মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি বড় প্রশ্ন—শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই দীর্ঘ ইতিহাসসমৃদ্ধ ইরানকে পরাজিত করতে পারবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি সরল সামরিক শক্তির নয়; বরং ইতিহাস, কৌশল ও সহনশীলতার এক জটিল সমীকরণ।
ইহুদি জাতির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। তাদের যাত্রা শুরু হয় প্রাচীন কেনান অঞ্চলকে ঘিরে। ধর্মীয় বর্ণনায় দেখা যায়, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধারা থেকে বনি ইসরায়েলের উদ্ভব, যা হজরত ইসহাক (আ.) ও হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম ছিল ‘ইসরায়েল’, এবং তাঁর বংশধরেরাই পরিচিত হয় বনি ইসরায়েল নামে।
এই জাতির মধ্যে বহু নবী-রাসুল প্রেরিত হন—হজরত মুসা (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত সুলাইমান (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.) তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ধর্মীয় দিকনির্দেশনা পাওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসে বারবার তারা বিচ্যুতি, শাস্তি, নির্বাসন ও পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী, হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সময় বনি ইসরায়েল মিসরে অবস্থান শুরু করে। প্রথমদিকে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও পরে ফেরাউনের শাসনে দাসত্ব ও নির্যাতনের শিকার হয়। হজরত মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে তারা মিসর ত্যাগ করে মুক্তি লাভ করে। তবে নির্দেশ অমান্য করার কারণে দীর্ঘ সময় মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনাও তাদের ইতিহাসে রয়েছে।
পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে তাদের শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তালুত (আ.), দাউদ (আ.) ও সুলাইমান (আ.)-এর সময় একটি ঐক্যবদ্ধ রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয় এবং রাজ্যটি দুই ভাগে ভেঙে পড়ে—উত্তরে ইসরায়েল এবং দক্ষিণে ইয়াহুদা। এই বিভক্তি তাদের দুর্বল করে তোলে। পরবর্তীতে উত্তর অংশ অ্যাসেরীয়দের এবং দক্ষিণ অংশ ব্যাবিলনীয়দের হাতে পতিত হয়। ফলে ইহুদিদের প্রথম বড় নির্বাসন শুরু হয়। পরে পারস্য শাসক সাইরাস তাদের নিজ ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেন।
গ্রিক ও রোমান শাসনামলেও এই অঞ্চল বারবার ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী হয়। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমানদের অধীনে জেরুজালেম ধ্বংস হলে ইহুদিরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে—যা দ্বিতীয় বৃহৎ নির্বাসন হিসেবে পরিচিত। এরপর তারা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করে।
আধুনিক সময়ে ১৯১৭ সালের ঘোষণার মাধ্যমে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় এবং ১৯৪৮ সালে নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়। সেই থেকে অঞ্চলটি বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে দেশটি একটি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। সরাসরি সামরিক শক্তির পাশাপাশি তারা বিকল্প বা অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, বৈশ্বিক জোট এবং অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে এগিয়ে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসমর্থনও বড় ভূমিকা রাখে।
কিছু সামরিক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ সহজ হবে না। কারণ দেশটি সরাসরি সংঘর্ষের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব ও মিত্র শক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে সক্ষম। এতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি কেবল জয়ের নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। তারা এমন কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যস্ত ও চাপে রাখা হয়। এ ধরনের কৌশলে সরাসরি পরাজয় না হলেও প্রতিপক্ষের শক্তি ক্ষয় হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—একদিকে তুলনামূলকভাবে নবীন রাষ্ট্র এবং অন্যদিকে হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি সভ্যতা; এদের মধ্যে সংঘাতের ফলাফল কীভাবে নির্ধারিত হবে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাতের উত্তর সরল নয়। এটি সামরিক শক্তির পাশাপাশি সময়, কৌশল এবং ধৈর্যেরও পরীক্ষা। সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই দ্বন্দ্ব দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে, যেখানে জয়-পরাজয়ের সংজ্ঞাও ভিন্নভাবে নির্ধারিত হবে।

