ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটিতে সীমিত সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ঘোষিত নৌ অবরোধ বজায় রেখে চাপ বাড়ানোর কৌশলও বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানে বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। সীমিত হামলার পাশাপাশি পূর্ণমাত্রার বোমা হামলার বিষয়টিও আলোচনায় আসে, যদিও সেটিকে আপাতত কম সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক এসকর্ট মিশন চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর অংশ হিসেবে সাময়িক নৌ অবরোধ বজায় রেখে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
তবে সামরিক বিকল্প বিবেচনায় থাকলেও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—যেমন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ও বিদ্যুৎকেন্দ্র—লক্ষ্যবস্তু করার হুমকিও দেন। তার এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একসঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই পথেই এগোতে চাইছে।
ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন কয়েকটি কঠোর শর্ত নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা, কোনো টোল না নেওয়া, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা। পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা কাঠামো মেনে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া লেবানন ও ইয়েমেনভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার দাবিও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ আরোপ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর উপায় হতে পারে, কারণ দেশটির বড় অংশের আয় তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে আসে। তবে এই কৌশলেরও বড় ঝুঁকি রয়েছে। সংকীর্ণ এই নৌপথে অবস্থানরত মার্কিন জাহাজগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, এই উত্তেজনার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
এদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের আলোচনা পুরোপুরি ব্যর্থ নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরি হওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সামরিক চাপ, অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—এই দ্বিমুখী কৌশল মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে। সামনে সংঘাত বাড়বে নাকি নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুলবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

