পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের মুখেও ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—কোনো হুমকির কাছেই তারা মাথা নত করবে না।
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা হুমকির কাছে তেহরান কখনোই নতি স্বীকার করবে না। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পুনরায় বিমান হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের পাশাপাশি সীমিত আকারে বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। ইতোমধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, পাকিস্তানে হওয়া আলোচনায় দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের “সর্বোচ্চ চাপ, বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং অবরোধের কৌশল” আলোচনাকে ভেঙে দেয়।
শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গালিবাফ এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিকল্পনাকে ব্যঙ্গ করে বলেন, তেলের দাম বেড়ে গেলে মার্কিন জনগণ অতীতের সস্তা জ্বালানির দিনগুলো স্মরণ করবে।
এদিকে ইরানের নৌবাহিনীও সতর্ক বার্তা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, দেশের জলসীমার দিকে অগ্রসর হওয়া যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে “কঠোর ব্যবস্থা” নেওয়া হবে। এতে করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সরকার দাবি করছে, এটি সাইবার হামলা প্রতিরোধের জন্য নেওয়া হয়েছে। তবে এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যবহারকারীরা—যাদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা, সরকারপন্থী ব্যক্তি, কিছু সাংবাদিক এবং সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রয়েছেন। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকরা উচ্চমূল্যে বিকল্প উপায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, যেমন স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ।
এই বিকল্প ব্যবস্থার খরচও অত্যন্ত বেশি। প্রতি গিগাবাইট ডেটার জন্য প্রায় ৬ ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা দেশটির গড় আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। এমনকি অনুমোদনহীনভাবে এই ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য শাস্তির ঝুঁকিও রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরান এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি—বাইরে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ, ভেতরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। তবে তেহরানের বার্তা স্পষ্ট: তারা কোনো চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। এখন দেখার বিষয়, এই অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুলে দেয়।

