এপ্রিল ৭, ২০২৬—এই দিনটি শুধু আরেকটি যুদ্ধদিন হিসেবে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, পশ্চিমা জনমত এবং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা-রাজনীতির মোড় ঘোরানো এক দিন হিসেবে মনে রাখা হতে পারে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা পড়ছিল ইরানে। পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলাও চলছিল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি কেবল আরেকটি সামরিক সংঘাত। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়েও বড় লড়াই শুরু হয়েছে জনমত, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কৌশলগত সাফল্যকে ঘিরে।
সেদিনই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টার এমন এক জরিপ প্রকাশ করে, যা ইসরায়েল-সমর্থনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আবহে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের ৬ জন, অর্থাৎ ৬০ শতাংশ মার্কিনি ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। গত বছর এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। একইভাবে ৫৯ শতাংশ মার্কিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন, যেখানে গত বছর এই হার ছিল ৫২ শতাংশ।
এই সংখ্যাগুলোকে শুধুই সাময়িক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এগুলো আসলে আরও বড় এক বাস্তবতার প্রতিফলন—ইসরায়েলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের জনমনে যে দীর্ঘদিনের স্বতঃসিদ্ধ সমর্থনের ধারণা ছিল, তা এখন আর আগের জায়গায় নেই।
আমেরিকায় সমর্থন কমছে, আর তাতেই বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
পিউ জানায়, গত ২৩ থেকে ২৯ মার্চ—অর্থাৎ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার সময়—এই জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপে শুধু ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান—কোনো একক রাজনৈতিক শিবির নয়, বরং প্রধান দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেই ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বেড়েছে। বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের নিচের মার্কিনিরা নিজেদের বিরক্তি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।
এখানে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের ভোটার কাঠামোতে তরুণদের প্রভাব বাড়ছে। সেই তরুণদের একটি বড় অংশ যদি ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্বকে আস্থার জায়গায় না রাখে, তাহলে এর প্রভাব ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণেও পড়বে। ফলে ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের লড়াই নয়; এটি ধীরে ধীরে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
ইসরায়েলিদের নিজেদের ভরসাতেও ফাটল
ইসরায়েলের ভেতরেও চিত্র খুব স্বস্তিদায়ক নয়। গত ৫ এপ্রিল সিএনএন, ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ইরানের সরকার পরিবর্তন নিয়ে ইসরায়েলিদের বিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আগে ৭০ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করতেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটতে পারে। এখন সেই হার নেমে এসেছে সাড়ে ৪৩ শতাংশে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসে ইসরায়েলের সক্ষমতা নিয়েও আস্থা কমেছে—আগে ৬২ শতাংশ বিশ্বাস করতেন ইসরায়েলের সেই ক্ষমতা আছে, এখন তা নেমে হয়েছে ৪৮ শতাংশ। একইভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার সক্ষমতার ক্ষেত্রেও আস্থা কমেছে ৭৩ শতাংশ থেকে ৫৭ শতাংশে।
এই পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোনো রাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষমতা শুধু অস্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; জনগণের বিশ্বাসও তার বড় অংশ। যদি জনগণই মনে করতে শুরু করে যে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না, তাহলে সামরিক সাফল্যের গল্পও রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে।
এমনকি, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নেও ইসরায়েলিরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অর্থাৎ যুদ্ধের লক্ষ্য যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই সেগুলো বাস্তবসম্মত কি না—সে প্রশ্নও বাড়ছে।
“ইসরায়েলমুক্ত” আমেরিকা—এটা কি কেবল স্লোগান, নাকি নতুন রাজনৈতিক প্রবণতা?
গত ১০ এপ্রিল টাইমস অব ইসরায়েল একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ও ইহুদিবিরোধী মনোভাব আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, কংগ্রেস নির্বাচনের জন্য এমন প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন, যারা নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্বনির্ভর অবস্থান সামনে আনছেন—যেমন, নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের জন্য ‘ইসরায়েল ও ইহুদিরা’ দায়ী, চার্লি কার্ককে হত্যার পেছনে ‘মোসাদের হাত’ ছিল, কিংবা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ছিল ‘সাজানো নাটক’—এ ধরনের দাবিও তারা তুলছেন।
এই ধরনের বক্তব্য মূলধারার রাজনীতিতে একসময় প্রান্তিক ছিল। এখন যদি এগুলো নির্বাচনী আলোচনায় জায়গা পেতে শুরু করে, তবে বোঝা যায় যে ক্ষোভ বা সন্দেহ কেবল সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজনৈতিক রূপও নিচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষ এখন দেশটির রাজনীতি ও নির্বাচনকে “ইসরায়েলের প্রভাবমুক্ত” এবং “ইসরায়েলের অর্থমুক্ত” দেখতে চান। এটি শুধু একটি প্রতিক্রিয়াশীল আবেগ নয়; বরং আমেরিকার বৈদেশিক নীতি নিয়ে মানুষের অস্বস্তির সরাসরি প্রকাশ।
গত ১১ এপ্রিল, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা শুরুর আগে ইরানের অন্যতম উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ রেজা আরেফ এক্স-এ লেখেন—যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলের স্বার্থ নয়, নিজের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এই মন্তব্যটি ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি হলেও, তা অনেক মার্কিন বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও মিলে যায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক মার্কিন গবেষক জন মিয়ারশিমার, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই ইউটিউবে পোস্ট করা এক পডকাস্টে টাকার কার্লসনকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যতই “আমেরিকা ফার্স্ট” বলুক, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বাস্তবতা প্রায়ই “ইসরায়েল ফার্স্ট”-এর মতো দেখায়। এই পর্যবেক্ষণ এখন আর একাডেমিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; জনমতেও এর প্রতিধ্বনি বাড়ছে।
তথ্যযুদ্ধেও বদল: কেন মার্কিনিরা আল জাজিরার দিকে ঝুঁকলেন
যুদ্ধের সময়ে মানুষ শুধু বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্রের খবর দেখে না; তারা দেখতে চায় কে সত্যি বলছে, কে গোপন করছে, আর কে ঘটনাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে। গত ৯ এপ্রিল দ্য জেরুসালেম পোস্ট জানায়, ইরান যুদ্ধের খবর জানতে বিপুল সংখ্যক মার্কিনি কাতারভিত্তিক আল জাজিরার ওপর নির্ভর করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউটিউবে আল জাজিরা ইংলিশের সাবস্ক্রাইবার বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ৯০ হাজার। তুলনায় সিএনএন-এর সাবস্ক্রাইবার ১ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার। গত এক মাসে আল জাজিরা ইংলিশের সাবস্ক্রাইবার বেড়েছে ৫ লাখ। অন্যদিকে ফক্স নিউজের সাবস্ক্রাইবার ১ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার—অর্থাৎ আল জাজিরা ইংলিশের তুলনায় কম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিনি ইরান যুদ্ধের খবর নিয়েছেন আল জাজিরার মাধ্যমে। আল জাজিরা আরবির সাবস্ক্রাইবার ২ কোটি ৩০ লাখ ১০ হাজারের মতো। সব ভাষা মিলিয়ে ইউটিউবে আল জাজিরার মোট সাবস্ক্রাইবার ৪ কোটির বেশি, অথচ সিএনএন ও ফক্স নিউজের মোট সাবস্ক্রাইবার ৩ কোটি ৪০ লাখ ৪০ হাজার।
এই পরিসংখ্যান শুধু মিডিয়া জনপ্রিয়তার তথ্য নয়। এগুলো দেখায়, পশ্চিমা মূলধারার বাইরে থাকা কোনো প্ল্যাটফর্মও এখন যুদ্ধের বয়ান নির্ধারণে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। দ্য জেরুসালেম পোস্টের বিশ্লেষণে এমন কথাও উঠে আসে যে, আগামী দশকে তথ্যযুদ্ধে পেন্টাগনের ব্রিফিং বা পশ্চিমা বিশেষজ্ঞমহলের গবেষণার তুলনায় আল জাজিরার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
এখানেই আসে আরেকটি বড় বৈপরীত্য। গাজা ও পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন এবং আল জাজিরার সাংবাদিকদের হত্যার বিষয়সহ নানা ঘটনা ‘সবিস্তার’ তুলে ধরার অভিযোগে নেতানিয়াহু সরকার আল জাজিরাকে ইসরায়েলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অর্থাৎ, যে প্ল্যাটফর্মকে ইসরায়েল ঠেকাতে চায়, সেই প্ল্যাটফর্মই আন্তর্জাতিক জনমতের বড় অংশে প্রভাব বিস্তার করছে।
যুদ্ধের ভেতর নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ঝুঁকি
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় মাত্রা হলো—এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কতটা বিপন্ন করছে। গত ১০ এপ্রিল টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, ৯ এপ্রিল প্রকাশিত গণমাধ্যম জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির জনসমর্থন কমার ইঙ্গিত মিলেছে। এর পেছনে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ায় ইসরায়েলিদের একাংশ নেতানিয়াহুর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কান, বেসরকারি চ্যানেল টুয়েলভ এবং চ্যানেল থার্টিন-এর পৃথক জরিপে দেখা যায়, এই মুহূর্তে ১২০ আসনের নেসেটে নির্বাচন হলে নেতানিয়াহুবিরোধী কট্টর জায়নবাদী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি যেতে পারে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন।
জরিপে কানের হিসাবে ৫৯ আসন, চ্যানেল টুয়েলভ-এর হিসাবে ৬০ আসন, আর চ্যানেল থার্টিন-এর হিসাবে ৫৫ আসন পেতে পারে নেতানিয়াহুবিরোধী রক্ষণশীল জায়নবাদী দলগুলো। অর্থাৎ, বিরোধীদের শক্তি বাড়ছে, কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের মতো স্থিতিশীল জোট গড়া এখনও সহজ নয়।
এই অবস্থায় যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে তিনি এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন; অন্যদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং ঘোষিত লক্ষ্য অর্জিত না হলে সেটাই তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রমাণে পরিণত হবে।
ইসরায়েলের আগামী জাতীয় নির্বাচন আগামী অক্টোবরে হওয়ার কথা। তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি যেকোনো অজুহাতে সেই নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এ অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—তার নেতৃত্ব নিয়ে আস্থা প্রশ্নের মুখে।
বিরোধীদের ভাষায়: সামরিক সাফল্য থাকলেও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
একই দিনে দ্য জেরুসালেম পোস্ট জানায়, নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ মন্তব্য করেছেন, বাস্তবতা আরও কঠিন। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল—ইরানে শাসক পরিবর্তন হয়নি, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনও ইসরায়েলে এসে পড়ছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিও বন্ধ হয়নি। ফলে সামরিক অভিযান কিছু সাফল্য দেখালেও কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েল কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি।
লাপিদের মতে, সেনারা তাদের কাজ করেছে, সাধারণ মানুষ কষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু নেতানিয়াহু রাজনৈতিক নেতৃত্বে ব্যর্থ হয়েছেন। এই মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যুদ্ধের প্রচলিত “বিজয়” বয়ানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
ইসরায়েলের আরেক বিরোধীনেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইয়ার গোলানও একই সুরে বলেন, সরকার যদি কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না করতে পারে, তবে সামরিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত মূল্যহীন হয়ে পড়বে। এই কথার ভেতরেই ইসরায়েলের বর্তমান সংকটের সারকথা আছে—বোমা ফেলেই সব সমস্যা মিটে যায় না।
ইউরোপও অস্বস্তিতে: ইরান সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে
গত ১০ এপ্রিল বিবিসি একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—গোটা প্রজন্ম বিশ্বকে দেখবে ইরান সংঘাতের চোখ দিয়ে। এই মন্তব্য করেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারর্মার। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ৩ দিনের সফরে সৌদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও কাতারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
স্টারর্মার বলেন, পশ্চিমের দেশগুলোর মতো মধ্যপ্রাচ্যেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, এবং ইরান সংঘাতের প্রভাব মাথায় রেখে পুরো একটি প্রজন্ম বিশ্বব্যবস্থাকে বিচার করবে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এই সংঘাত তার দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বিষয়টি বিতর্ক তৈরি করেছে। রিফর্ম ইউকে-র নেতা নাইজেল ফারাজ সতর্ক করে বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক নষ্ট করছেন। বিপরীতে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন আমেরিকাকে নির্ভরতার জায়গা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গত ৯ এপ্রিল দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিন পার্টির প্রধান জ্যাক পোলানস্কি মনে করেন, লেবাননে হামলার পর যুক্তরাজ্যের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসা। অর্থাৎ, ইরান সংঘাত শুধু সামরিক কৌশল নয়, বাণিজ্য, কূটনীতি ও জোটনীতিকেও নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
যুদ্ধের খরচ: সামরিক অর্জন বনাম কৌশলগত লোকসান
একই দিনে, ইসরায়েলের হারেৎজ পত্রিকার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ থেকে ইসরায়েল যে শিক্ষা পেয়েছে, তার জন্য তেল আবিবের খরচ হয়েছে ১৬ থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ক শুধু অর্থনৈতিক চাপের কথা বলে না; এটি দেখায়, যুদ্ধের মূল্য শুধু সামরিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগতও।
বিশ্লেষণটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরান দুর্বল হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু একইসঙ্গে তেহরান নতুন এক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের বাস্তবতাও তৈরি করেছে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষকে আঘাত করা গেছে, কিন্তু তাতে পরিস্থিতি সহজ হয়নি; বরং নতুন অনিশ্চয়তা জন্ম নিয়েছে।
আর গত ১০ এপ্রিল দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, কিভুন রিসার্চ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড কমিউনিকেশনস-এর মিৎশেল বারাক মনে করেন, নেতানিয়াহু অবশ্যই এটিকে বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরবেন। কিন্তু বিরোধীরা বলবে, এটি তার বিজয় নয়, বরং ব্যর্থতা।
এই পর্যায়ে এসে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়—যুদ্ধ কি ইসরায়েলকে নিরাপদ করেছে, নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে?
শেষ কথা: যুদ্ধের ময়দানে শক্তি, কৌশলে দুর্বলতা
সব তথ্য একসঙ্গে রাখলে একটি স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন কমছে। তরুণ মার্কিনিরা আরও সমালোচনামুখর। ইসরায়েলিদের নিজেদের মধ্যেও নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক তথ্যযুদ্ধে আল জাজিরার মতো প্ল্যাটফর্ম প্রভাব বাড়াচ্ছে। ইউরোপে মিত্ররাও অস্বস্তিতে। আর দেশের ভেতরে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও চাপে।
এই বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষকের কাছে বিষয়টি আর কেবল “ইরানে হামলা” নয়; বরং এটি এমন এক সংঘাত, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তা-রাজনীতির দুর্বল দিকগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সামরিকভাবে কিছু অর্জন দেখানো গেলেও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন কমেনি, বরং বেড়েছে। আর সেখানেই উঠে আসে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি—নেতানিয়াহু কি ইসরায়েলকে এমন এক যুদ্ধে টেনে এনেছেন, যেখান থেকে বের হওয়া জেতার চেয়েও কঠিন?
হতে পারে, ইতিহাস পরে এই সংঘাতকে শুধু ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা হিসেবে দেখবে না। বরং এটিকে এমন এক মোড় হিসেবে দেখবে, যখন যুদ্ধের ভাষা যত জোরালো হয়েছে, নেতানিয়াহুর কৌশল তত বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে—এবং ইসরায়েল বুঝতে শুরু করেছে, সব যুদ্ধ জেতা মানেই সব সংকট থেকে বেরিয়ে আসা নয়।

