মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি আর স্থিতিশীলতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসরায়েল এখন পরিষ্কারভাবে তার সেনাবাহিনীকে নতুন সংঘাতের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত করছে। সামরিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক নির্দেশনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তেল আবিব ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতিকে সাময়িক বিরতি হিসেবে দেখছে, স্থায়ী সমাধান হিসেবে নয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির সেনা ইউনিটগুলোকে যুদ্ধ প্রস্তুতির অবস্থায় যেতে বলেছেন। তার নির্দেশনার মূল কথা হলো, বাহিনীকে আরও দ্রুত সাড়া দেওয়ার উপযোগী করতে হবে, অপারেশনাল দুর্বলতা কমাতে হবে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত কেবল একটি রুটিন সতর্কতা নয়; বরং এটি এমন এক সংকেত, যা জানিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েই দেখছে।
কেন এই প্রস্তুতি তাৎপর্যপূর্ণ
ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, দেশটির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ইরানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়াচ্ছে। বিশেষভাবে সামরিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে নতুনভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য সংঘাত আবার শুরু হলে ইসরায়েল শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকবে না, বরং আগাম আঘাত হানার সক্ষমতাও প্রস্তুত রাখছে।
একই সঙ্গে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীও হালনাগাদ হামলা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। এসব পরিকল্পনায় দীর্ঘপাল্লার অভিযান, লক্ষ্যভেদে নির্ভুলতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এটি দেখায় যে ইসরায়েল স্বল্পমেয়াদি সংঘর্ষের জন্য নয়, বরং দীর্ঘায়িত এবং কৌশলগতভাবে জটিল এক সম্ভাব্য যুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করছে।
আক্রমণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষাও জোরদার
শুধু আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নয়, ইসরায়েল নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে। ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে দেশটি তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধকে একমুখী অভিযান হিসেবে ভাবছেন না। বরং তারা এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় এই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। কারণ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত মানে কেবল দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ নয়; এটি দ্রুতই বহু-মাত্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মিত্র গোষ্ঠী এবং সীমান্তবর্তী অন্যান্য ফ্রন্টও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যে কঠোর সুর
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরিস্থিতিটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে এখনো সমৃদ্ধ উপাদান রয়েছে, এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন বলেছেন, তা সরিয়ে ফেলতে হবে। তার মতে, এটি হয় চুক্তির মাধ্যমে হবে, না হলে অন্য কোনো উপায়ে হবে।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর। কারণ নেতানিয়াহু এখানে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি, কিন্তু একই সঙ্গে সামরিক পথকেও খোলা রেখেছেন। অর্থাৎ, আলোচনা যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না দেয়, তাহলে শক্তি প্রয়োগের যুক্তি তৈরির রাজনৈতিক ভিত্তিও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
জনবল সংকটে চাপের মুখে ইসরায়েলি বাহিনী
যুদ্ধের প্রস্তুতির আরেকটি বড় দিক হলো জনবল সংকট। ইসরায়েলি বাহিনীর জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ১২,০০০ নতুন সদস্যের প্রয়োজন হয়েছে। কারণ রিজার্ভ সেনাদের ওপর চাপ অনেক বেড়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা চাকরি, পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন।
এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাষ্ট্র যত শক্তিশালী সামরিক ভাষাই ব্যবহার করুক, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরই এসে পড়ে। অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং কৌশল যতই উন্নত হোক, পর্যাপ্ত ও টেকসই মানবসম্পদ ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
মার্চ মাসে ইয়াল জামির রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ আবার ৩৬ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হোক। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে এই মেয়াদ ৩০ মাস-এ নামিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, রিজার্ভ সেনারাই বারবার ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হবেন এবং তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেবেন। এই সতর্কবার্তা থেকে বোঝা যায়, সামরিক প্রস্তুতির আড়ালে মানবিক ক্লান্তি এবং সামাজিক চাপও দ্রুত বাড়ছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচও বিশাল
এই সংঘাতের আর্থিক প্রভাবও কম নয়। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল বারো-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় যুদ্ধের ব্যয় ৩৫ বিলিয়ন শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন পাউন্ড হিসেবে অনুমান করেছে। এটি কেবল একটি হিসাবি সংখ্যা নয়; বরং এর ভেতরে রয়েছে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সামরিক ব্যয়, অবকাঠামোগত চাপ, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তা।
কোনো দেশের জন্য যুদ্ধ কেবল সীমান্ত বা আকাশপথে লড়াই নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরেও সমানভাবে বিস্তার লাভ করে। রিজার্ভ বাহিনী সক্রিয় থাকলে শ্রমবাজারে চাপ পড়ে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়লে অন্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও বাজার স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ইসরায়েলকে অর্থনৈতিক সহনশীলতার পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে জনমত নেতিবাচক
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো জনমত। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে জনগণের বড় অংশ ইতিবাচকভাবে দেখছে না। কান নামের ইসরায়েলি সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের জরিপে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জিতেছে কি না—এই প্রশ্নে ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, না।
এই ফলাফলকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এতে বোঝা যায়, জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে সামরিক অভিযান সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত কৌশলগত সাফল্য আসেনি। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। আবার অন্যদিকে, এমন মনোভাব ভবিষ্যৎ সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকিও বাড়ায়। কারণ যখন জনগণ মনে করে লড়াই শেষ হয়নি, তখন যুদ্ধবিরতিও অনেক সময় স্থায়ী সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায় না।
লেবানন ফ্রন্ট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে
ইরান-সংকট এখন একা দাঁড়িয়ে নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে লেবাননও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান লেবাননে যুদ্ধবিরতি চায়। তবে ইসরায়েল লেবাননের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা পথে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। অর্থাৎ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকলেও তা একক ও সমন্বিত নয়; বরং বহুস্তরীয়, বিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল।
এদিকে লেবাননে ভারী বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে এবং শনিবার প্রায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন। এটি বোঝায়, এই সংকট এখন আর একক ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতার রূপ নিচ্ছে।
পোপ লিওর শান্তির আহ্বান
রোববার দুপুরের প্রার্থনা শেষে পোপ লিও লেবাননের মানুষের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি লেবাননের মানুষের আরও কাছাকাছি অনুভব করছেন এবং সব পক্ষকে যুদ্ধ থামিয়ে শান্তির পথ খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্মীয় নেতার এই আহ্বান সরাসরি যুদ্ধ থামাতে না পারলেও, এটি আন্তর্জাতিক মানবিক উদ্বেগের মাত্রাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষণ: সামনে কী দেখা যাচ্ছে
সব দিক মিলিয়ে পরিস্থিতির মধ্যে কয়েকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।
প্রথমত, ইসরায়েল ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখছে না। বরং তাদের ভাষা ও প্রস্তুতি বলে দিচ্ছে, তারা এই পর্বকে অসমাপ্ত একটি সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
দ্বিতীয়ত, লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানো, বিমানবাহিনীর নতুন হামলা পরিকল্পনা, আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং সেনা সদস্য বাড়ানোর প্রয়োজন—এসব একসঙ্গে ঘটছে। তাই এটিকে বিচ্ছিন্ন কিছু পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ-প্রস্তুতির লক্ষণ।
তৃতীয়ত, ইসরায়েল নিজেও গভীর চাপে রয়েছে। ১২,০০০ নতুন সদস্যের প্রয়োজন, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা, রিজার্ভ সেনাদের ক্লান্তি এবং ৩৫ বিলিয়ন শেকেল ব্যয়ের হিসাব—এসব দেখায় যে যুদ্ধের সামর্থ্য থাকা আর দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ বহন করা এক জিনিস নয়।
চতুর্থত, জনমতের অবস্থানও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৫৮ শতাংশ মানুষ যদি মনে করেন যুদ্ধ জেতা হয়নি, তাহলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত আবার একই সঙ্গে অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীলও করতে পারে।
পঞ্চমত, লেবাননের পরিস্থিতি এই পুরো সংকটকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। কারণ একটি সক্রিয় সীমান্ত ফ্রন্ট থাকলে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা খুব সহজেই বহু-ফ্রন্টের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
১২ এপ্রিল ২০২৬-এর পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্য এখন আবারও এক অনিশ্চিত ও বিস্ফোরক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি, ইরানে নতুন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর ভাষা, ১২,০০০ সেনার প্রয়োজন, যুদ্ধের ৩৫ বিলিয়ন শেকেল ব্যয় এবং ৫৮ শতাংশ জনমতের অসন্তোষ—সবকিছু মিলিয়ে একটাই বার্তা পাওয়া যায়: যুদ্ধবিরতি থাকলেও স্থায়ী শান্তি এখনো অনেক দূরে।
বরং বর্তমান চিত্র বলছে, এটি হয়তো নতুন এক পর্যায়ের আগের প্রস্তুতিপর্ব। যেখানে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সব পথ খোলা রাখা হচ্ছে। তাই ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের বর্তমান পদক্ষেপকে শুধু সামরিক কৌশল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।

