বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—নিয়ে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। সর্বশেষ আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হয়নি, বরং মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, ইরানকে ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রাখতে হবে। কিন্তু এই শর্তকে অযৌক্তিক হিসেবে দেখছে তেহরান। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য এই কার্যক্রম সীমিত রাখতে রাজি।
এই প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাবের মধ্যেই মূল অচলাবস্থা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই পাঁচ বছরের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি—তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়া—মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যদিও শুরুতে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমাতে পারে, তবে পরে তারা এই অবস্থান থেকেও সরে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তাত্ত্বিকভাবে এই উপাদান পুনরায় অস্ত্র-গ্রেডে উন্নীত করার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এই পরিস্থিতিতে আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে আরেক দফা মুখোমুখি বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা চললেও এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এর আগে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও একই ইস্যুতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। পারমাণবিক কার্যক্রমের সীমা ও সময়কাল নিয়ে দ্বিমতই ছিল প্রধান বাধা। শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই মার্কিন প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর দায় চাপায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট, ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও স্বল্পমেয়াদি সমঝোতায় সন্তুষ্ট হতে চাইছে না। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের এই দূরত্বই আলোচনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সমঝোতা না হলে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

