মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি যেন বাস্তবে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। লেবানন-এর দক্ষিণাঞ্চলে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল, যার ফলে নতুন করে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চালানো হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ জনে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, শনিবার (২ মে) চালানো এসব হামলায় প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে নিহতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২ হাজার ৬৫৯ জনে, আর আহত হয়েছেন ৮ হাজার ১৮৩ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ জেলার শৌকিন শহরে এক হামলায় তিনজন নিহত হন। এর আগে কফর দাজ্জাল গ্রামে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় দু’জনের মৃত্যু হয়। লোয়াইজেহ গ্রামে একটি বাড়িতে আঘাত হানলে আরও তিনজন প্রাণ হারান। একই দিনে শৌকিন এলাকায় পৃথক আরেকটি হামলায় আরও দু’জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও রক্ষা পাচ্ছে না। নাবাতিয়েহ শহরের আল-কুদস মোড়ের কাছে বিমান হামলা চালানো হয়, পাশাপাশি টাইর জেলার সিদ্দিকিন এলাকাও যুদ্ধবিমানের আঘাতে কেঁপে ওঠে। এসব হামলা প্রমাণ করছে, সংঘাতের বিস্তার এখন অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই চুক্তি বারবার ভেঙে যাচ্ছে। একদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে হামলা—এই দ্বৈত বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইসরাইল দাবি করছে, তাদের লক্ষ্য মূলত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সদস্যরা। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন গল্প বলছে। নিহতদের বড় একটি অংশই সাধারণ বেসামরিক মানুষ, যারা সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়িত নন। ফলে এই হামলাগুলো শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে হলে শুধু কাগুজে চুক্তি যথেষ্ট নয়—তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, আস্থার সংকট এবং পারস্পরিক সন্দেহ এতটাই গভীর যে, কোনো পক্ষই পুরোপুরি পিছিয়ে আসতে প্রস্তুত নয়।
সব মিলিয়ে, লেবাননের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর মাটিতে বাড়তে থাকা লাশের সংখ্যা একটি কঠিন সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে—যুদ্ধবিরতি ঘোষণাই শান্তির নিশ্চয়তা নয়। যতক্ষণ না বাস্তবে অস্ত্র নীরব হয়, ততক্ষণ এই সংঘাতের মূল্য গুনতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
সিভি/এইচএম

