মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির কেন্দ্রে থাকা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। বহু আলোচিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ হঠাৎ করেই স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক অভিযানের বিরতি নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বৃহত্তর কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ, সেখানে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে পারাপারের জন্য এই অভিযান শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দিয়ে জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হতে সহায়তা করা। কিন্তু শুরু থেকেই এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল ইরান। তাদের দাবি ছিল, এটি সরাসরি যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন এবং নিজেদের আঞ্চলিক কর্তৃত্বের ওপর হস্তক্ষেপ।
অবশেষে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, আপাতত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধ এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অগ্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই স্থগিতাদেশকে পুরোপুরি পিছু হটা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। অর্থাৎ, সামরিক চাপ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি; বরং এটি এখন কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত দুই দিকেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা সামরিক উপস্থিতি ও চাপ ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চায়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার জন্য একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আক্রমণাত্মক ধাপ শেষ হয়েছে এবং এখন আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। তার এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে আলোচনার পথে এগোতে চায়।
তবে বাস্তবতা হলো, এই পুরো পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে আন্তর্জাতিক বাজারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি আসলে একটি কৌশলগত বিরতি। এটি সময় নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা—যাতে একদিকে উত্তেজনা কমানো যায়, অন্যদিকে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিরতি কি স্থায়ী শান্তির দিকে নিয়ে যাবে, নাকি এটি কেবল আরও বড় কোনো সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি? হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।
সিভি/এইচএম

