ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সামনে থাকা কোনো পথই সহজ নয়। হামলা বাড়িয়েও তেহরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। আবার যুদ্ধ বন্ধ করতে গেলে ইরানের এমন কিছু দাবি বিবেচনা করতে হতে পারে, যেগুলো মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর।
বুধবার নতুন করে ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আরও কঠোর আঘাত দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু তীব্র ভাষা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরও তিনি এখনো দেখাতে পারেননি যে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা সম্ভব।
অন্যদিকে যে কূটনৈতিক উদ্যোগকে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেটিও অস্পষ্ট ভাষায় তৈরি একটি সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়ার পর কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো এখন আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
একটি পথ হতে পারে স্থলযুদ্ধ শুরু করা। কিন্তু তাতে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আরেকটি পথ হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর প্রভাব কোনোভাবে স্বীকার করা। কিন্তু সেটি মেনে নিলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দীর্ঘদিনের অবাধ নৌচলাচলের নীতিতে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে।
এই কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে এমন একটি সংকট বলা হচ্ছে, যেখানে কোনো ভালো বিকল্প নেই।
সামরিক চাপ কেন কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের মূল ধারণা ছিল, ব্যাপক হামলা চালিয়ে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামোকে এমন চাপের মুখে ফেলা হবে, যাতে তেহরান আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সামরিক ক্ষতির পরও ইরান তার মূল দাবিগুলো থেকে সরে আসছে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখার প্রশ্নে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও দেশটির রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি বদলে দেওয়া যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি হামলার পর ইরান নিজের অবস্থান রক্ষাকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা লাইল গোল্ডস্টেইন পরিস্থিতিকে গভীর সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সমঝোতাও রাজনৈতিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক।
যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে পুরো বিশ্ব
ইরান যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে সংঘাতে সরাসরি অংশ না নেওয়া দেশগুলোর ওপরও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চাপ তৈরি হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি যদি অধিকাংশ বেসামরিক জাহাজের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হবে। বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। ডিজেল ও সারের মতো তেলনির্ভর পণ্যের মূল্য বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শীতকালে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির আশঙ্কাও তৈরি হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিলাসবহুল পর্যটন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিদেশি পেশাজীবীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলেছিল। যুদ্ধ সেই নিরাপদ ও সমৃদ্ধ অঞ্চলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত করেছে।
ইউরোপের দুর্বল সরকারগুলোও যুদ্ধজনিত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চাপের মুখে পড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন নয়, খাদ্য উৎপাদন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ এবং দৈনন্দিন পণ্যের মূল্যেও এর প্রভাব পড়ে।
ফলে হরমুজের সংকট এখন আর শুধু নৌপথের প্রশ্ন নয়। এটি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বড় হুমকি
যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন ও এসএসআরএসের নতুন জরিপে দেখা গেছে, ইরাননীতি এবং জ্বালানির মূল্য নিয়ে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে জনসমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
এই পরিসংখ্যান নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগজনক। জনসমর্থন এমন পর্যায়ে থাকলে দলটি নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
২০২৪ সালে ট্রাম্প ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রা আরও সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে তেল, জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য বাড়তে থাকলে সেই প্রতিশ্রুতিই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
২০২৬ সালের ২২ জুলাই ডেলাওয়ারের ডোভার বিমানঘাঁটিতে সেনাবাহিনীর প্রথম লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহানের মরদেহ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ধরনের দৃশ্য মার্কিন জনগণের সামনে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও স্পষ্ট করে তুলছে।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি প্রশ্ন উঠবে—এই সংঘাতের লক্ষ্য কী, বিজয় বলতে কী বোঝানো হচ্ছে এবং কত প্রাণ ও অর্থ ব্যয় করার পর যুক্তরাষ্ট্র থামবে?
শেষ ফল কী হতে পারে, তা বোঝা যাচ্ছে
হরমুজ সংকটের সম্ভাব্য শেষ অবস্থা কল্পনা করা কঠিন নয়। কঠিন বিষয় হলো সেখানে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ তৈরি করা।
একটি সম্ভাব্য সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা চাইতে পারে, যাতে তাকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে না হয় যে হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানও দেশে দাবি করতে পারবে যে, যুদ্ধের ফলে নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হরমুজে তার প্রধান কৌশলগত অর্জন রক্ষা পেয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা যুদ্ধ থামাতে এবং পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে সেই অবস্থায় পৌঁছানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। উত্তেজনা কমাতে হলে প্রণালিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইরের শক্তিগুলোকেও নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করতে হতে পারে।
আশার দুটি সম্ভাব্য পথ
বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও দুটি সম্ভাবনা আলোচনায় রয়েছে।
প্রথমটি হলো, ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা। এই প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং সেখান থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে এমনভাবে ব্যবস্থা করা হবে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকে।
এই ধারণার আভাস আগে বাতিল হয়ে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেও ছিল। সেখানে ইরান ও ওমানকে পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার কাঠামো নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল।
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর উদ্যোগে আসতে পারে। চলতি সপ্তাহে ব্রিটেনের আয়োজনে হরমুজে জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে এ ধরনের বহুপক্ষীয় কূটনীতির ধারণা আবারও সামনে আসতে পারে। কারণ ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বর্তমান অচলাবস্থা থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে ঘোষিত একমাত্র কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে ইরান ও ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে। প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হলে কীভাবে জাহাজ চলাচল পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ওমানের আপত্তি ও একটি মধ্যপন্থা
তেহরান চায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট অর্থ আদায় করা হোক। কিন্তু ওমান এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
ওমানের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলো দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। তাই সরাসরি পথ ব্যবহারের কর আরোপ করা আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
তবে ওমান একটি মধ্যপন্থার প্রস্তাব দিচ্ছে। সরাসরি যাতায়াতের জন্য অর্থ না নিয়ে সামুদ্রিক সেবা প্রদানের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হতে পারে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাহাজকে শুধু চলাচলের অধিকার দেওয়ার জন্য অর্থ নেওয়া এবং নিরাপত্তা, পথনির্দেশ, উদ্ধার, পরিবেশ সুরক্ষা ও অন্যান্য সেবার জন্য অর্থ নেওয়া এক বিষয় নয়।
একটি সঠিক কাঠামো তৈরি হলে ইরান কিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেতে পারে, আবার অবাধ নৌচলাচলের আন্তর্জাতিক নীতিও আনুষ্ঠানিকভাবে অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হতে পারে।
হরমুজে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা কীভাবে কাজ করতে পারে
লন্ডনভিত্তিক বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে হরমুজকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ের ধারণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবটি এমন নয় যে, জাহাজগুলোকে প্রণালি অতিক্রম করার জন্য সরাসরি কর দিতে হবে। বরং পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোকে জলপথের ব্যবস্থাপনা ও সেবায় অবদান রাখার জন্য অর্থ দেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে মালাক্কা প্রণালির মতো একটি কাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা মালাক্কা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভূমিকা রাখে।
সম্ভাব্য আয়ের হিসাব করতে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজগুলোকে প্রতি মোট মেট্রিক টন পণ্যের জন্য প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য আট ডলার পরিবেশ সুরক্ষা মূল্য দিতে হয়।
পারস্য উপসাগরে একই হারে অর্থ নেওয়া হলে নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ২৬ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
ইরান হয়তো এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ চাইতে পারে। তারপরও তেলের প্রতি ব্যারেলে দুই ডলারের মতো অতিরিক্ত খরচ বিশ্ববাজারের ব্যাপক অস্থিরতার চেয়ে কম ক্ষতিকর হতে পারে।
বুধবার এক দিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ দশমিক শূন্য শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠেছে। এই অস্থিরতার তুলনায় একটি নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য সেবা মূল্য অনেক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
ইরান কি শুধু অর্থ চায়
এই পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ইরানের মূল আগ্রহ শুধু হরমুজ থেকে অর্থ উপার্জন নয়।
বিশ্লেষক এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক লক্ষ্য আরও বড়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল রপ্তানির পথও আবার উন্মুক্ত হতে পারে।
এগুলো হরমুজে সামান্য অর্থ আদায়ের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বড় অর্থনৈতিক লাভ।
তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি তেহরানকে রাজনৈতিক সুবিধাও দিতে পারে। ইরান দেশের জনগণকে বলতে পারবে, যুদ্ধের পর হরমুজ আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি এবং সংঘাতে তারা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়নি।
অর্থাৎ ইরান দেখাতে পারবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেও তারা নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রেখেছে।
এই সমঝোতা কি পুরো যুদ্ধের সমাধান করবে
হরমুজ নিয়ে একটি চুক্তি সংঘাত কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থাকা সব বিরোধের সমাধান করবে না।
প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থিতিশীল করা গেলেও ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ থেকেই যাবে।
অর্থাৎ হরমুজ চুক্তি যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া একটি নতুন সংকট সামলাতে পারবে, কিন্তু পুরোনো বিরোধের উত্তর দেবে না।
এর মধ্যেই ট্রাম্প আবার ইরানে হামলা শুরু করেছেন। ফলে অর্থবহ কূটনীতি আরও কিছু সময়ের জন্য স্থগিত থাকতে পারে।
তবু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প কমে আসায় শেষ পর্যন্ত একটি আপস অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। লাইল গোল্ডস্টেইনের মতে, এটি সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক সমঝোতাগুলোর একটি হবে।
কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবাধ নৌচলাচলকে তাদের প্রধান আন্তর্জাতিক নীতিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছে। এখন হরমুজে ইরানের বিশেষ প্রভাব মেনে নেওয়া হলে সেই নীতির সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হবে।
কেন ইউরোপকে প্রয়োজন হতে পারে
অন্যান্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলে সম্ভবত ইরান সংকটের শুরুতেই ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তা চাইতেন। মিত্রদের যুক্ত করলে কূটনৈতিক চাপ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হতো।
ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের পারমাণবিক চুক্তির পেছনে ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, ইউরোপের অনেক দেশ সেই যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
কিন্তু ট্রাম্পের সময়ে আটলান্টিকের দুই পাশের সম্পর্ক গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুল্ক ও কঠোর মন্তব্যের মাধ্যমে ট্রাম্প দীর্ঘদিনের মিত্রদেরও প্রায় প্রতিপক্ষের মতো আচরণ করেছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে তিনি অনেক মিত্রের সঙ্গে পরামর্শ করেননি। ইউরোপের বহু দেশ এই যুদ্ধকে বেআইনি ও অবিবেচনাপ্রসূত হিসেবে দেখেছে। আবার সামরিক অভিযানে যোগ না দেওয়ায় ট্রাম্প তাদের সমালোচনাও করেছেন।
এই কারণে দুর্বল ইউরোপীয় সরকারগুলোর অনেকেরই এখন ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করার আগ্রহ কম।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো হরমুজে তাদের উল্লেখযোগ্য মাইন অপসারণ সক্ষমতা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে এর শর্ত ছিল, আগে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট কৌশল বড় বাধা
ওমান বা ইউরোপ কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলেও একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত কৌশল কী?
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলসভিত্তিক জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়ান লেসারের মতে, কোনো সম্মত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইউরোপকে সহায়তা করতে বলা এক বিষয়। কিন্তু বর্তমানে কোনো সম্মত কৌশলই নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশল কী, সেটিও পরিষ্কার নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত দ্রুত বদলে যাওয়ায় মিত্রদের পক্ষে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
একদিন কূটনীতির কথা বলা হচ্ছে, পরদিন নতুন হামলা চালানো হচ্ছে। কখনো ইরানকে কঠোর শাস্তির হুমকি দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো আলোচনার দরজা খোলা থাকার কথা বলা হচ্ছে।
এই অসঙ্গতি তেহরানের মধ্যেও অবিশ্বাস সৃষ্টি করছে। ইরান মনে করতে পারে, হরমুজে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্র পরে আবার সামরিক চাপ বাড়াবে।
ওমানের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি ইরান
তেহরানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ জানিয়েছেন, ইরান ওমানের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যখন হামলা বাড়াচ্ছে, তখন ইরান হরমুজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান শেষ পর্যন্ত প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে। কারণ জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থেরও বিরুদ্ধে যাবে।
কিন্তু তেহরান সম্ভবত একটি আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে তা করতে চাইবে। একই সঙ্গে ইরান এমন সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, যখন তার নেতৃত্ব মনে করবে যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছে।
অর্থাৎ ইরান শুধু একটি অর্থনৈতিক চুক্তি চাইছে না। তারা রাজনৈতিকভাবে এমন একটি ফল চায়, যেটিকে দেশে বিজয় বা অন্তত সফল প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরা যাবে।
২০২৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দৃশ্য
২০২৬ সালের ২৭ জুলাই মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাষ্ট্রীয় বিমানে উঠতে দেখা যায়। তখন ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ নিয়ে তাঁর প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছিল।
এর আগে ২০২৬ সালের ২২ জুলাই ডোভার বিমানঘাঁটিতে ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার মরদেহ ফিরিয়ে আনা হয়। ঘটনাটি যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতিকে সামনে নিয়ে আসে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩০ মে তেহরানের রাস্তায় ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী প্রচারফলক দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে, হরমুজ এখন ইরানের জন্য শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক প্রচার ও জাতীয় প্রতিরোধের প্রতীকেও পরিণত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সমাধান কোথায়
ইরান যুদ্ধের বর্তমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কোনো সহজ বিজয়ের পথ নেই।
আরও হামলা চালালে ইরানের সামরিক ক্ষতি বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এতে তেহরান আলোচনায় ফিরবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মার্কিন সেনা, আঞ্চলিক মিত্র এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।
স্থলযুদ্ধে গেলে বিপুল প্রাণহানি ও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি থাকবে। আবার হরমুজে ইরানের প্রভাব স্বীকার করলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার দীর্ঘদিনের অবাধ নৌচলাচলের নীতি থেকে কার্যত কিছুটা সরে আসতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে যৌথ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার ধারণাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে সামনে আসছে। এতে ইরান রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে বেসামরিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহও স্বাভাবিক করা সম্ভব হতে পারে।
তবে কোনো সমঝোতা কার্যকর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার করতে হবে। ইউরোপ, ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও তখন মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
ওমান, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করতে না পারার মূল্য ইতিমধ্যে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি দ্রুত হামলা ও পাল্টা হামলার ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বের হতে না পারে, তাহলে বাইরের শক্তিগুলোর সামনে হস্তক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত হরমুজই হয়তো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সংকট এবং সম্ভাব্য সমাধান—দুটিই হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প ও ইরানি নেতৃত্ব নিজেদের বিজয়ের ভাষা বজায় রেখেই এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন কি না, যা উভয় পক্ষকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটার রাজনৈতিক সুযোগ দেবে।

