পাকিস্তানের জন্মের ইতিহাস বলতে সাধারণত ভারত বিভাজন, দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথাই সামনে আসে, কিন্তু এই প্রচলিত বর্ণনার ভেতরেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়- বেলুচিস্তানের কালাত। কারণ ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর কালাতকে শুরুতেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। বরং কিছু সময়ের জন্য এটি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। আর এই ঘটনায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট জটিল।
তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, পাকিস্তান যখন মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল তখন বেলুচিস্তানের মতো একটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে জিন্নাহ শুরুতে পাকিস্তানের বাইরে রাখার অবস্থান কেন নিয়েছিলেন? পরে আবার সেই অবস্থান কেন বদলে গেল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ১৯৪৭ সালের দিকে তাকালে হবে না। বুঝতে হবে কালাতের রাজনৈতিক ইতিহাস, ব্রিটিশদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, দেশভাগের সময় দেশীয় রাজ্যগুলোর অবস্থান এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আজকের পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং ঐতিহাসিক বেলুচিস্তানকে এক জিনিস হিসেবে দেখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হবে। ঐতিহাসিক বেলুচ অঞ্চল বর্তমান পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত ছিল। এই বিস্তৃত ভূখণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল কালাত। এখান থেকেই গড়ে উঠেছিল খানাত অব কালাত।
কালাতের রাজনৈতিক ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। বিভিন্ন বালুচ গোত্র ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে আহমদজাই খানদের নেতৃত্বে কালাত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত হয়। কালাতের খান শুধু একটি ভূখণ্ডের শাসক ছিলেন না, বালুচ গোত্রগুলোর একটি কনফেডারেশনেরও প্রধান ছিলেন। ফলে কালাতের পরিচয় কেবল একটি সাধারণ দেশীয় রাজ্যের মতো ছিল না; এর নিজস্ব রাজনৈতিক ঐতিহ্য, নেতৃত্ব এবং স্বায়ত্তশাসনের ধারণা ছিল।
ব্রিটিশদের আগমনের পর এই স্বাধীনতার পরিসর অবশ্য সংকুচিত হয়। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা কালাতের সঙ্গে একাধিক চুক্তি করে এবং ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে। ১৮৩৯ সালে প্রথম এংলো-আফগান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সামরিক অভিযান কালাতের স্বাধীন ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে। তারপরও কালাতের খান পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাননি। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত কালাতের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান টিকে ছিল।
এই জায়গাটিই ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ ব্রিটিশ ভারত শুধু ব্রিটিশদের সরাসরি শাসিত প্রদেশ নিয়ে গঠিত ছিল না। এর পাশাপাশি ছিল শত শত দেশীয় রাজ্য বা প্রিন্সলি স্টেট। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গে এসব রাজ্যের ওপর ব্রিটিশদের কর্তৃত্বও শেষ হয়ে যায়। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন দেখা দেয়।
এখানে পাঞ্জাব বা বাংলার সঙ্গে কালাতের পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। পাঞ্জাব ও বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি শাসিত প্রদেশ। তাই সেগুলোর ভাগের ক্ষেত্রে সীমান্ত নির্ধারণ, জনসংখ্যার ধর্মীয় গঠন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে কালাত ছিল একটি দেশীয় রাজ্য। ফলে তার ক্ষেত্রে একই নিয়ম সরাসরি প্রযোজ্য ছিল না।
কালাতের সামনে তখন মূলত তিনটি সম্ভাবনা ছিল—ভারতে যোগ দেওয়া, পাকিস্তানে যোগ দেওয়া অথবা স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করা।
কালাতের শাসক খান আহমদ ইয়ার খান স্বাধীন থাকার পক্ষেই আগ্রহী ছিলেন। শুধু শাসক নয়, কালাতের অভ্যন্তরেও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়া নিয়ে মতৈক্য ছিল না। সেখানে বালুচ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটেছিল। কালাত স্টেট ন্যাশনাল পার্টি ছিল এই রাজনৈতিক প্রবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানেই জিন্নাহর প্রাথমিক অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বেলুচিস্তান কী স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে যোগদান করেছিল?
জিন্নাহ শুধু পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি আইনজীবীও ছিলেন। দেশীয় রাজ্যগুলোর সাংবিধানিক অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। কালাতের রাজনীতির সঙ্গে তার পূর্বপরিচয়ও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় কালাতকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে জিন্নাহর অবস্থান শুরুতে পাকিস্তানের পরবর্তী নীতির সঙ্গে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল।
অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে জিন্নাহ বেলুচিস্তানকে পছন্দ করতেন না বা বেলুচদের পাকিস্তানে চাননি। বরং প্রশ্নটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর কালাতের মতো একটি দেশীয় রাজ্যের নিজস্ব অবস্থান কী হবে?- সেই প্রশ্নে জিন্নাহ শুরুতে তার স্বাধীন অবস্থানের সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছিলেন।
এখানেই পাকিস্তানের আদর্শিক ভিত্তি এবং বাস্তব রাষ্ট্রনীতির মধ্যে প্রথম বড় সংঘাতটি দেখা যায়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক যুক্তির কেন্দ্রে ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য পৃথক রাষ্ট্রের ধারণা। কিন্তু কালাতের প্রশ্নে দেখা গেল, শুধু মুসলমান হওয়াই কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি নয়। বালুচদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয়, ভূখণ্ড, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল। কালাতের জাতীয়তাবাদীরা যুক্তি দিচ্ছিলেন—মুসলমান হওয়া মানেই পাকিস্তানের অংশ হওয়া আবশ্যক নয়।
এই যুক্তিটি পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর ছিল।
কারণ পাকিস্তান যদি স্বীকার করে যে, মুসলিম পরিচয়ের পাশাপাশি আলাদা জাতীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতেও একটি অঞ্চল স্বাধীন থাকতে পারে, তাহলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠনের যুক্তির সামনে একটি নতুন প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়। আর সেই প্রশ্নটি ছিল- পাকিস্তান কি শুধু মুসলমানদের রাষ্ট্র, নাকি বিভিন্ন মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র?
১৯৪৭ সালের শেষ দিকে এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কালাতের অভ্যন্তরে এমন রাজনৈতিক মতও ছিল যে, বালুচদের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয় ইরান ও আফগানিস্তানের বালুচদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। ফলে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার যুক্তি তারা মেনে নিতে চাইছিল না। কালাতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণাকে সমর্থন করছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য কালাতকে স্বাধীন রেখে দেওয়া ছিল কৌশলগতভাবে কঠিন।
মানচিত্রের দিকে তাকালেই এর কারণ বোঝা যায়।
কালাতের ভূখণ্ড পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এর অবস্থান আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি। বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ উপকূল এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে একটি স্বাধীন কালাত ভবিষ্যতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারত।
নতুন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান তখন এমনিতেই নানা সংকটে ছিল। একদিকে ভারত, অন্যদিকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত ও রাজনৈতিক প্রশ্ন, আর পশ্চিমাঞ্চলে একটি সম্ভাব্য স্বাধীন রাষ্ট্র—সব মিলিয়ে কালাতকে পুরোপুরি স্বাধীন অবস্থায় রেখে দেওয়া পাকিস্তানের রাষ্ট্রকৌশলের সঙ্গে সহজে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
এই জায়গাতেই জিন্নাহর অবস্থানের পরিবর্তনকে দেখতে হবে।
জিন্নাহর প্রাথমিক অবস্থান ছিল আইনগত ও সাংবিধানিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতা ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল। ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের সংহতি এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন তার সামনে নতুনভাবে হাজির হয়।
এখানে ব্যক্তিগত মতের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড় হয়ে উঠেছিল।
কালাতের সঙ্গে পাকিস্তানের আলোচনা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে কালাত পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু এই সংযুক্তি বেলুচ রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত তৈরি করে। কারণ বালুচ জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ এটিকে স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে যোগদান হিসেবে দেখেনি। বরং তারা এটিকে কেন্দ্রের চাপ এবং সামরিক শক্তির মাধ্যমে কালাতের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থানের অবসান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ব্যাখ্যার পার্থক্যই পরবর্তী কয়েক দশকের বেলুচিস্তান সংকটের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আর এখানেই জিন্নাহকে ঘিরে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রশ্নটি তৈরি হয়।
যে জিন্নাহ ১৯৪৭ সালে কালাতের স্বাধীন অবস্থানের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তিনিই পরে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে কালাতের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিলেন কেন?
এর একক কোনো উত্তর নেই।
কারও ব্যাখ্যায় এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন। কেউ দেখেন পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্ন হিসেবে। আবার বালুচ জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে ঘটনাটিকে দেখা হয় প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে কেন্দ্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে।
তবে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার- ১৯৪৭ সালের আগে এবং ১৯৪৭ সালের পরে জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানকে একই প্রেক্ষাপটে বিচার করা যায় না।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে জিন্নাহ ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন রাজনৈতিক নেতা এবং আইনজীবী। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে ওঠেন, যার অস্তিত্ব তখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। রাষ্ট্রটির ভূখণ্ড, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা- সবকিছুই ছিল নাজুক অবস্থায়।
এই বাস্তবতাই সম্ভবত কালাত প্রশ্নে তার অবস্থানের পরিবর্তনকে বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। দেশীয় রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের পরিসর কমতে থাকে। সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব বাড়তে থাকে। ফলে কালাতের মতো অঞ্চলের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য তৈরি হয়।
পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজেই যখন পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বালুচ, পশতুনসহ বিভিন্ন জাতিগত ও আঞ্চলিক পরিচয়কে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করতে শুরু করল, তখন নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদ মাথা তুলল।
বেলুচিস্তানে সেই জাতীয়তাবাদ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবাহগুলোর একটি।
কারণ বেলুচদের কাছে বিষয়টি কেবল পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা বা না থাকার প্রশ্ন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ভূমি, সম্পদ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক।
এই কারণেই ১৯৪৮ সালের কালাত সংকটকে শুধু দেশভাগের একটি ছোট ঘটনা হিসেবে দেখলে বেলুচিস্তানের বর্তমান সংকট বোঝা সম্ভব নয়। বরং এটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের মুহূর্তে কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব।
আর সেই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
জিন্নাহ কেন বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন?
“জিন্নাহ কেন বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন?”- প্রশ্নটির সরল উত্তর হয়তো হবে, তিনি শুরুতে কালাতের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থানের আইনগত সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা, নিরাপত্তা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন তার অবস্থান বদলে দেয়।
অর্থাৎ এটি শুধু জিন্নাহর ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের গল্প নয়। এটি মূলত একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের পর আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সংঘাতের গল্প।
আর বেলুচিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই- একটি রাষ্ট্রের মানচিত্রে কোনো অঞ্চলকে যুক্ত করা যতটা সহজ, সেই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়কে একই রাষ্ট্রের সঙ্গে মানসিকভাবে একীভূত করা ততটা সহজ নয়।
কালাত পাকিস্তানের মানচিত্রের অংশ হয়ে গেলেও বালুচ জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং ১৯৪৮ সালের সেই ঘটনাই পরবর্তী দশকগুলোর রাজনৈতিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের জন্য একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে।
আজও পাকিস্তানের বেলুচিস্তান সংকটের দিকে তাকালে তাই শুধু বর্তমানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেখলে হবে না। ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭-৪৮ সালের সেই সন্ধিক্ষণে, যখন একটি নতুন রাষ্ট্র তার ভূখণ্ড নির্ধারণ করছিল এবং একটি পুরোনো রাজনৈতিক সত্তা নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল।
সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই শুধু “কালাত পাকিস্তানে কীভাবে যুক্ত হলো?” নয়। বরং প্রশ্ন হলো- একটি রাষ্ট্রের জন্মের সময় যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির সীমা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছিল?
বেলুচিস্তানের সংকট বুঝতে হলে এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি জরুরি।

