আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ২৬তম পার্লামেন্ট বা নেসেট নির্বাচন। ভোটের দেড় মাসেরও কম সময় আগে দেশটির নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দল লিকুদ জানিয়েছে, আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জয়েন্ট লিস্ট ও ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রামকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার জন্য নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হবে।
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর লিকুদ জানায়, দল দুটি ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং হামাস ও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ কারণে তাদের নেসেট নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা বাতিলের দাবি জানাবে দলটি। তবে ঘোষণায় অভিযোগগুলোর পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগেই কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত পার্টি রাম ও দলটির নেতা মানসুর আব্বাসকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার আবেদন করেছে। তাদের দাবি, রাম ইসরায়েলকে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করে। রামের বিরুদ্ধে ওই আবেদন করা হয় ৯ সেপ্টেম্বর। ফলে আরব দলগুলোর নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিয়ে চাপটি শুধু লিকুদের উদ্যোগ নয়; নেতানিয়াহুর ডানপন্থি শিবিরের একটি বৃহত্তর নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠছে।
কেন আরব দলগুলোকে ঠেকাতে চাইছে লিকুদ?
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত সরকার গঠনের ৬১ আসনের সমীকরণ। ইসরায়েলের নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। এবারের নির্বাচনে জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর শিবির ও তাঁর বিরোধীদের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে ১০ থেকে ১৩টির মতো আসন পেতে পারে- এমন আরব দলগুলো শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যেমন, ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি জরিপে নেতানিয়াহুর জোটকে ৫২টি, তাঁর বিরোধী জায়নবাদী দলগুলোকে ৫৭টি এবং আরব দলগুলোকে ১১টি আসন দেওয়া হয়েছিল। অন্য আরেকটি সাম্প্রতিক জরিপে ডানপন্থি-ধর্মীয় ব্লককে ৫৯ এবং আরব দলগুলোকে ১২ আসন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জরিপভেদে চিত্র পাল্টালেও অনেক সমীকরণেই আরব দলগুলোর কয়েকটি আসন সরকার গঠন বা ঠেকানোর ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
তবে আরব দল ছাড়া বিরোধীদের সরকার গঠন একেবারেই অসম্ভব-এ কথাও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি মারিভ জরিপে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের ৬১ আসনে পৌঁছানোর একটি সম্ভাব্য পথ দেখা গেছে, যেখানে আরব দলগুলোর সমর্থনের প্রয়োজন হবে না। ফলে নির্বাচনের আগের এই পর্যায়ে আরব দলগুলো ‘অবশ্যই কিংমেকার’ – এমন সিদ্ধান্তের বদলে তাদের সম্ভাব্য কিংমেকার বলা বেশি যথাযথ।
আইজেনকটকে ‘আরবনির্ভর’ দেখানোর চেষ্টা
সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নতুন দল ইয়াশার এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। নিউজ ১২-এর ৭ সেপ্টেম্বরের জরিপে ইয়াশার ২৫টি এবং লিকুদ ২১টি আসন পেয়েছিল। তবে সব জরিপ একই ফল দিচ্ছে না; কোনো কোনো জরিপ ও জরিপ-গড়ে দুই দল কাছাকাছিও রয়েছে।
এই অবস্থায় লিকুদের প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- আইজেনকট ক্ষমতায় যেতে চাইলে শেষ পর্যন্ত ইয়ার গোলান, অ্যাভিগডোর লিবারম্যান এবং আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে- এমন ধারণা ভোটারদের মধ্যে তৈরি করা।
এটি নিছক আসনের হিসাব নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতাকে সামনে এনে লিকুদ মধ্য ও ডানপন্থি ইহুদি ভোটারদের বোঝাতে চাইতে পারে যে নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার হবে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অথবা এমন দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে অবস্থান ইসরায়েলের ডানপন্থিদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আরব দলগুলোর নতুন সমঝোতাও গুরুত্বপূর্ণ
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১২ সেপ্টেম্বর জয়েন্ট লিস্ট ও রাম একটি ‘সারপ্লাস ভোট’ চুক্তি করেছে। এর ফলে তারা পৃথকভাবে নির্বাচন করলেও আসন বণ্টনের সময় তাদের অবশিষ্ট ভোট একত্রে হিসাব করা যাবে এবং অতিরিক্ত একটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এর ঠিক পরদিনই দুই দলকে অযোগ্য ঘোষণার আবেদন করার কথা জানায় লিকুদ। দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক প্রমাণিত না হলেও সময়ের দিক থেকে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
জয়েন্ট লিস্ট বর্তমানে হাদাশ, তা’ল ও বালাদের সমন্বয়ে গঠিত। অন্যদিকে মানসুর আব্বাসের রাম এবার আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে রাম জয়েন্ট লিস্ট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিয়ে দলটি ইতিহাস সৃষ্টি করে। ইসরায়েলের কোনো সরকারে আনুষ্ঠানিক অংশীদার হওয়া সেটিই ছিল প্রথম আরব দলের ঘটনা।
এই ২০২১ সালের নজিরটিই এবারের রাজনৈতিক হিসাব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাম দেখিয়ে দিয়েছে, ছোট একটি আরব দলও খুব কাছাকাছি ফলের নির্বাচনে সরকার গঠন ও ক্ষমতার পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এবারের নির্বাচনে আবারও যদি নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবির কেউই ৬১ আসন না পায়, আরব দলগুলোর সমর্থন বা নিরপেক্ষ অবস্থানও সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
‘সন্ত্রাসে সমর্থন’ অভিযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
লিকুদের অভিযোগটি রাজনৈতিক হওয়ার পাশাপাশি আইনি দিক থেকেও কৌশলগত। ইসরায়েলের বেসিক ল-এর ৭এ ধারা অনুযায়ী কোনো দল বা প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে যদি তাদের লক্ষ্য বা কর্মকাণ্ডে ইসরায়েলকে ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে অস্বীকার করা, বর্ণবাদে উসকানি দেওয়া অথবা শত্রু রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী সংগঠনের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থনের প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ‘সন্ত্রাসে সমর্থন’ অভিযোগটি সরাসরি নির্বাচনী অযোগ্যতার আইনি ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে অভিযোগ করলেই কোনো দল নিষিদ্ধ হয়ে যাবে- বিষয়টি এত সহজ নয়। অতীতে ইসরায়েলের সেন্ট্রাল ইলেকশনস কমিটি একাধিকবার আরব দল বা প্রার্থীর নির্বাচনী অংশগ্রহণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেও সুপ্রিম কোর্ট সেসব সিদ্ধান্তের অনেকগুলোই উল্টে দিয়েছে। ২০০৩ সালে বালাদ ও আহমদ তিবির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত বাতিল হয়; ২০০৯ সালেও বালাদ ও রাম-তা’লকে নির্বাচনে ফিরিয়ে দেয় আদালত। ২০১৯ সালেও রাম-বালাদকে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল।
ফলে বর্তমান উদ্যোগের ক্ষেত্রেও লিকুদকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, আইনি মানদণ্ড অনুযায়ী যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন কোনো নিষেধাজ্ঞা দিলেও বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারে।
তাহলে লক্ষ্য কি শুধু দল দুটিকে নিষিদ্ধ করা?
সম্ভবত নয়। লিকুদের উদ্যোগের অন্তত ৩টি রাজনৈতিক সুবিধা থাকতে পারে।
প্রথমত, আরব দলগুলো সত্যিই বাদ পড়লে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প কমে যাবে। তবে তাদের আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিকুদের কাছে চলে যাবে না; সংশ্লিষ্ট ভোটাররা অন্য দলকে ভোট দিতে পারেন কিংবা ভোটদানে অনুপস্থিত থাকতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, আবেদন শেষ পর্যন্ত আদালতে ব্যর্থ হলেও লিকুদ নির্বাচনী প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তা, হামাস, হিজবুল্লাহ এবং আরব দলগুলোর অবস্থান নিয়ে বিতর্ককে সামনে রাখতে পারবে। যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরার জন্য এটি নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।
তৃতীয়ত, এর মাধ্যমে আইজেনকটের সম্ভাব্য সরকারকে ‘আরব দলনির্ভর সরকার’ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ আইনি আবেদনটি সফল হওয়া যেমন একটি লক্ষ্য, তেমনি আবেদনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক প্রচারণাটিও নিজে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে।
তবে এই কৌশলের উল্টো প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। আরব দলগুলোকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আরব ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করলে তাদের ভোটদানের হার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন বা আদালত আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে লিকুদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচনী আইন ব্যবহারের অভিযোগও উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াচ্ছে?
আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর বিরুদ্ধে লিকুদের বর্তমান পদক্ষেপ তাই শুধু ‘সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১২০ আসনের নেসেটে ৬১ আসনের অত্যন্ত টাইট সমীকরণ, গাদি আইজেনকটের উত্থান, ২০২১ সালে রামের সরকার গঠনে ভূমিকার নজির এবং আরব ভোটকে ঘিরে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন।
ফলে জয়েন্ট লিস্ট ও রামকে ঠেকানোর উদ্যোগকে একই সঙ্গে আইনি লড়াই, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নির্বাচনী প্রচার এবং সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ সংকুচিত করার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত দল দুটি নির্বাচনে থাকবে কি না, সেটি নির্বাচন কমিশন ও প্রয়োজন হলে সুপ্রিম কোর্ট ঠিক করবে। কিন্তু আবেদনটির রাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে- কারণ ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কে সবচেয়ে বেশি আসন পাবে, তার পাশাপাশি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, কে কাদের সমর্থন নিয়ে ৬১-র ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছাবে।

