গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সংক্ষিপ্ত সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর আট ঘণ্টারও কম সময় সেখানে অবস্থান করে তিনি ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তাঁর এই সফর ঘিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং তা কার্যকরের আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বিমান গ্রিস, ইতালি ও ফ্রান্সের আকাশসীমা ব্যবহার করে নিউইয়র্কে পৌঁছায়। তিন দেশই আইসিসির প্রতিষ্ঠাতা রোম সংবিধির সদস্য। তবে ফ্রান্স বলেছে, কোনো রাষ্ট্রীয় বিমানে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তি থাকলে শুধু আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোম সংবিধি তাকে বিমান থামিয়ে গ্রেপ্তারের কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পাসকাল কনফাভ্রু এ অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
নিউইয়র্কেও গ্রেপ্তারের সুযোগ ছিল না
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়েও গ্রেপ্তারের প্রশ্ন উঠেছিল। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি আগে বলেছিলেন, নেতানিয়াহু শহরে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, এ ধরনের গ্রেপ্তার করার আইনি ক্ষমতা তাঁর নেই। নেতানিয়াহু জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পর একই দিন নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা ছিল।
জাতিসংঘে তীব্র ভাষণ, ওয়াকআউট
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জোরালো প্রতিবাদ করেন। গাজায় গণহত্যার অভিযোগকে তিনি ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলে আখ্যা দেন।
তাঁর বক্তব্যের সময় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তাঁদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু ‘নৈতিক কাপুরুষ’ মন্তব্য করেন। তাঁর জাতিসংঘ ভাষণের আগে তিনি জানিয়েছিলেন, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরাই হবে তাঁর বক্তব্যের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কেন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়। সেই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আইসিসি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট তৈরির মতো বিষয় রয়েছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এবং আইসিসির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। ফলে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এই কারণেই নেতানিয়াহুর কোনো আইসিসি সদস্য দেশে সফর করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনি বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইসিসির বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন আদালটির এখতিয়ার ও কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে আইসিসির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন পুরো আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিয়েছে। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আদালটিকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং কয়েকজন বিচারক ও কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রই আইসিসির সদস্য এবং আদালটির সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে ইউরোপে তুলনামূলকভাবে জোরালো সমর্থন রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুর ইউরোপীয় আকাশসীমা ব্যবহার এবং ফ্রান্সের দেওয়া আইনি ব্যাখ্যা আইসিসির পরোয়ানা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় বিমানের চলাচল এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে।

