আজ ২ অক্টোবর। ভারতে দিনটি গান্ধী জয়ন্তী হিসেবে পালিত হয়। ২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ সভা এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস ঘোষণা করে, আর সদস্য দেশগুলো তা পালনে সম্মত হয়। একজন মানুষের জন্মদিন বিশ্বজুড়ে শান্তি ও অহিংসার প্রতীক হয়ে ওঠা সহজ ঘটনা নয়। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জীবন সেই বিরল দৃষ্টান্তগুলোর একটি।
১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর গুজরাতের পোরবন্দরে এক হিন্দু মোধ পরিবারে গান্ধীর জন্ম। তাঁর বাবা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান। মা পুতলিবা ছিলেন ধর্মপরায়ণ। ধার্মিক মা এবং গুজরাতের জৈন-প্রভাবিত পরিবেশের মধ্যে বড় হয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাস এবং ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতি সহিষ্ণুতার শিক্ষা পান।
পড়াশোনায় তিনি ছিলেন মাঝারি মানের ছাত্র। মাত্র ১৩ বছর বয়সে, ১৮৮৩ সালে, বাবা-মায়ের পছন্দে তাঁর বিয়ে হয় কস্তুরবার সঙ্গে। তাঁদের চার ছেলে হয়: হরিলাল, মনিলাল, রামদাস ও দেবদাস। পরিবারের ইচ্ছায় ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে যান।
লন্ডনে যাওয়ার আগে তিনি মায়ের কাছে শপথ করেছিলেন, মাংস, মদ ও উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে দূরে থাকবেন। সেখানে তিনি ইংরেজ আদবকায়দা কিছুটা পরীক্ষা করেছেন, যেমন নাচ শেখা। কিন্তু খাবার নিয়ে নিজের অবস্থানে অটল থেকেছেন। শুরুতে নিরামিষ খাওয়া ছিল মায়ের কথা রাখার বিষয়, পরে নিজে পড়াশোনা করে তিনি নিরামিষভোজনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি ‘নিরামিষভোজী সংঘে’ যোগ দেন, কার্যকরী কমিটির সদস্য হন এবং একটি স্থানীয় শাখাও চালু করেন। এই সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে কাজে লাগে।
নিরামিষভোজী সদস্যদের অনেকে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের উৎসাহে গান্ধী ভগবদ্গীতা পড়েন। ধর্মে আগে বিশেষ আগ্রহ না থাকলেও তিনি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন।
আইনজীবী হিসেবে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় নি*পীড়িত ভারতীয় নাগরিকদের অধিকারের আন্দোলনে প্রথম অহিংস ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন। ভারতে ফিরে তিনি দুঃস্থ কৃষক ও দিনমজুরদের সঙ্গে নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ও ব্যাপক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর তিনি সারা দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর স্বাধীনতা, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বর্ণবৈষম্য দূর করা এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য প্রচার চালান। এই সবকিছুর পেছনে লক্ষ্য ছিল স্বরাজ, অর্থাৎ বিদেশি শাসন থেকে ভারতের মুক্তি। ১৯৩০ সালে তিনি লবণ করের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডান্ডি লবণ পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও এই ধারার প্রতিবাদের প্রভাব দেখা যায়। এই পথে চলতে গিয়ে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
গান্ধীর সবচেয়ে বড় অবদান সত্যাগ্রহ আন্দোলন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ অহিংসার দর্শনের ওপর ভিত্তি করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের মত প্রকাশ করেছে। এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা ও অধিকারের আন্দোলনের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
গান্ধী সব পরিস্থিতিতেই অহিংসা ও সত্যের প্রতি অটল ছিলেন। তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন, একটি স্বায়ত্তশাসিত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং চরকায় নিজের বোনা ঐতিহ্যবাহী ধুতি ও শাল পরতেন। তিনি সাধারণ নিরামিষ খাবার খেতেন, শেষ জীবনে বেশি খেতেন ফলমূল। আত্মশুদ্ধি ও প্রতিবাদের জন্য দীর্ঘ সময় উপবাস করতেন।
ভারত সরকার তাঁকে ‘জাতির জনক’ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে। দেশে-বিদেশে তিনি ‘মহাত্মা’ (মহান আত্মা) ও ‘বাপু’ (বাবা) নামে পরিচিত। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁর মৃ*ত্যু হয়।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা।

