মানুষের মহাকাশযাত্রার ইতিহাস এখন আর মাত্র কয়েকটি পরাশক্তির গল্প নয়। যে মহাকাশ একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ছিল, সেখানে এখন বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের মানুষের পদচিহ্ন রয়েছে। পেশাদার মহাকাশচারী থেকে শুরু করে অর্থের বিনিময়ে যাওয়া বেসরকারি যাত্রী—সব মিলিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমানা পেরিয়ে মহাকাশে গেছেন অন্তত ৭৪৬ জন।
বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ উপলক্ষে এই ইতিহাস নতুন করে সামনে এসেছে। ৪ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মহাকাশ সপ্তাহ। ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ এই সপ্তাহ পালনের উদ্যোগ নেয়, মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবজীবনে কীভাবে অবদান রাখছে তা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে।
বিদ্যালয়, জাদুঘর, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সংগঠনগুলো এই সময় নানা আয়োজন করে। কোথাও রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ, কোথাও বিজ্ঞান প্রদর্শনী, কোথাও মহাকাশচারী ও বিজ্ঞানীদের আলোচনা—সব মিলিয়ে মহাকাশকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও পরিচিত করে তোলাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
আজকের মহাকাশ গবেষণা কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় দেশগুলোর অংশগ্রহণে। বর্তমানে ৮০টির বেশি দেশ পৃথিবীর কক্ষপথে নিজস্ব বা সহযোগিতামূলক উপগ্রহ পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৫০টির বেশি দেশের মানুষ কোনো না কোনোভাবে মহাকাশে ভ্রমণ করেছেন।
তবে এই অবস্থানে পৌঁছাতে মানবজাতিকে পাড়ি দিতে হয়েছে প্রায় সাত দশকের এক অসাধারণ যাত্রা।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠায় মানব ইতিহাসের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১। সেই ঘটনাকে মহাকাশ যুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র মহাকাশ প্রতিযোগিতা।
তার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ নিজেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে মহাকাশে পৌঁছে যায়।
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান। ভস্তক-১ মহাকাশযানে করে তিনি পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করেন।
তাঁর মহাকাশযানের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। পুরো যাত্রা স্থায়ী হয়েছিল ১০৮ মিনিট।
পৃথিবীতে ফেরার সময় গ্যাগারিন মহাকাশযান থেকে বেরিয়ে প্যারাসুটের সাহায্যে অবতরণ করেন।
এই অভিযান শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য ছিল না। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় যে একজন মানুষ উৎক্ষেপণের প্রচণ্ড চাপ, ভারশূন্য পরিবেশ এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের কঠিন পরিস্থিতি সহ্য করতে পারেন।
শীতল যুদ্ধের সময় এই সাফল্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতীকী অগ্রগতি এনে দেয়।
মহাকাশ প্রতিযোগিতা যত এগোতে থাকে, ততই মহাকাশ ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
১৯৬৭ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হয় বহির্মহাকাশ চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ এতে যুক্ত হয়।
এই চুক্তির অন্যতম মূলনীতি হলো, মহাকাশ কোনো একটি দেশের মালিকানাধীন অঞ্চল হতে পারে না। মহাকাশ অনুসন্ধান ও ব্যবহার শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত এবং কোনো দেশ মহাকাশের কোনো অংশকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারবে না।
এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মানবজাতি আরও বড় একটি ইতিহাস সৃষ্টি করে।
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম সফল অবতরণ ঘটে। অ্যাপোলো-১১ অভিযানের মাধ্যমে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখা প্রথম মানুষ হন।
মাত্র আট বছরের ব্যবধানে মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথে যাত্রা করা থেকে চাঁদের মাটিতে হাঁটার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মানব প্রযুক্তির ইতিহাসে এই অগ্রগতির গতি এখনও বিস্ময়কর।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও পুরোপুরি মীমাংসিত নয়—মহাকাশ আসলে কোথা থেকে শুরু হয়?
মহাকাশের সীমানা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে একক কোনো সংজ্ঞা নেই। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার উচ্চতাকে মহাকাশের শুরু হিসেবে ধরে।
এই সীমার নাম কারমান রেখা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, নাসা এবং দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ৮০ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতায় যাওয়া ব্যক্তিকেও মহাকাশযাত্রী হিসেবে বিবেচনা করে।
দুটি সংজ্ঞার মধ্যে ২০ কিলোমিটারের পার্থক্য থাকলেও মহাজাগতিক দূরত্বের হিসাবে এটি খুব বেশি নয়।
পৃথিবীর বিশালতার তুলনায় মহাকাশ আসলে আমাদের খুব কাছেই। পৃথিবীকে যদি একটি আপেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে মহাকাশের সীমানা শুরু হবে আপেলের খোসার পুরুত্বের কাছাকাছি দূরত্বে।
কারমান রেখাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরলে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশে গেছেন। তাঁরা ৫২টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এই তালিকায় রয়েছেন দীর্ঘ প্রশিক্ষণ পাওয়া পেশাদার মহাকাশচারী, বিজ্ঞানী, সামরিক পাইলট এবং সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের বিনিময়ে মহাকাশে যাওয়া বেসরকারি যাত্রী।
কিছু মহাকাশযাত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। আবার এমন অনেকেই মহাকাশে গেছেন এমন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে, যে রাষ্ট্র এখন আর বর্তমান মানচিত্রে নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সংখ্যার বিচারে এখনও দুটি দেশ অন্য সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ৩৬৯ জন মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীকালের রাশিয়ার সম্মিলিত সংখ্যা ১৩৮।
তৃতীয় স্থানে থাকা চীন এখন পর্যন্ত ২৯ জন মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে। এই দেশগুলো নিজস্ব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।
অন্য অনেক দেশের নাগরিক মহাকাশে গেলেও তারা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা অন্যান্য দেশের মহাকাশযানে যাত্রা করেছেন।
এই তালিকায় ভারতও খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসতে যাচ্ছে। দেশটি ২০২৭ সালে প্রথম মানববাহী গগনযান অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে। পরিকল্পনা সফল হলে ভারত নিজস্ব রকেটে মানুষ পাঠাতে সক্ষম চতুর্থ দেশ হবে।
মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি দ্রুত বাড়লেও নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
৭৪৬ জন মহাকাশযাত্রীর মধ্যে মাত্র ১১২ জন নারী। অর্থাৎ মোট মহাকাশযাত্রীর প্রায় ১৫ শতাংশ নারী।
সহজভাবে বললে, মহাকাশে যাওয়া প্রতি সাতজনের মধ্যে মাত্র একজন নারী।
এই বৈষম্যের ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। মহাকাশ কর্মসূচির প্রথম কয়েক দশকে সামরিক পাইলটদের মধ্য থেকে মহাকাশচারী নির্বাচনের প্রবণতা ছিল বেশি। সে সময় সামরিক বিমান চালনায় নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত ছিল।
তারপরও মহাকাশে প্রথম নারীর যাত্রা হয়েছিল খুব দ্রুত।
১৯৬৩ সালের জুনে সোভিয়েত মহাকাশচারী ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী হন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একজন নারীকে মহাকাশে পাঠাতে আরও ২০ বছর লেগেছিল। ১৯৮৩ সালের জুনে স্যালি রাইড প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে মহাকাশে যান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।
২০২০ সালের পর মহাকাশে যাওয়া নারীদের অর্ধেকের বেশি বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার মাধ্যমে সেখানে পৌঁছেছেন। কেউ অর্থের বিনিময়ে যাত্রী হিসেবে, আবার কেউ বিশেষ অতিথি হিসেবে বেসরকারি উপকক্ষপথীয় অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
এ থেকে বোঝা যায়, বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রা শুধু মহাকাশ শিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোই বদলাচ্ছে না, মহাকাশে কারা যেতে পারবেন সেই ধারণাটিও বদলে দিচ্ছে।
একসময় মহাকাশে যেতে হলে সামরিক পাইলট, বিজ্ঞানী অথবা কঠোর প্রশিক্ষিত সরকারি মহাকাশচারী হতে হতো। এখন ধনী ব্যক্তি, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন পেশার মানুষও বেসরকারি অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
মহাকাশযাত্রীদের বয়সের তথ্যেও একটি আকর্ষণীয় চিত্র রয়েছে।
প্রথম মহাকাশযাত্রার সময় অধিকাংশ যাত্রীর বয়স ছিল ৩০ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। মোট মহাকাশযাত্রীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এই দুই বয়সসীমার মধ্যে ছিলেন।
মহাকাশযাত্রীদের মধ্যম বয়স ৪০ বছর।তবে বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রার বিস্তার এই বয়সসীমাকে নাটকীয়ভাবে প্রসারিত করেছে।২০২১ সালে অলিভার ডেমেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে মহাকাশে গিয়ে সর্বকনিষ্ঠ মহাকাশযাত্রীর স্বীকৃতি পান।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে এড ডুয়াইট ৯০ বছর আট মাস বয়সে মহাকাশে যান। তিনি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বয়সে মহাকাশে যাওয়া ব্যক্তি।
তাঁর বয়স ২০২১ সালে মহাকাশে যাওয়া অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনারের তৎকালীন বয়সের চেয়ে প্রায় দুই মাস বেশি ছিল।
এই দুই উদাহরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মহাকাশযাত্রা ধীরে ধীরে এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে বয়সের প্রচলিত সীমাও আগের মতো কঠোর থাকছে না।মানব মহাকাশযাত্রার পরবর্তী বড় অধ্যায় আবারও চাঁদকে ঘিরে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে আর্টেমিস-২ অভিযানের মহাকাশচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরে পৌঁছান।
এর মাধ্যমে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩ অভিযানের করা মানুষের সর্বোচ্চ দূরত্বে যাওয়ার রেকর্ড ভেঙে যায়।
চন্দ্রাভিযানের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ২০২৭ সালে আর্টেমিস-৩ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পৃথিবীর কক্ষপথে একটি পরীক্ষামূলক অভিযান হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা, যেখানে ভবিষ্যৎ চন্দ্র অবতরণযানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হবে।
এর পরের বড় লক্ষ্য ২০২৮ সালের আর্টেমিস-৪ অভিযান।
এই অভিযানের মাধ্যমে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি আবার মানুষ নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সফল হলে ১৯৭২ সালের পর এটিই হবে চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম মানব অবতরণ।
অর্থাৎ প্রায় ৫৬ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে হাঁটতে পারে।তবে এবার লক্ষ্য শুধু সেখানে গিয়ে ফিরে আসা নয়।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বরফের সম্ভাব্য উপস্থিতি, ভবিষ্যৎ মহাকাশ ঘাঁটি এবং আরও দূরের গ্রহে অভিযানের প্রস্তুতির বিষয়গুলো এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
চাঁদ ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের পরীক্ষাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।মানব মহাকাশযাত্রায় আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো রাষ্ট্রীয় সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ।
একসময় মহাকাশ অভিযান ছিল প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। বিপুল অর্থ, সামরিক প্রযুক্তি এবং সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই খাতে প্রবেশ প্রায় অসম্ভব ছিল।
কিন্তু এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রকেট তৈরি করছে, মানুষ পাঠাচ্ছে, চন্দ্র অবতরণযান তৈরি করছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য অর্থের বিনিময়ে মহাকাশযাত্রার ব্যবস্থা করছে।
এর ফলে মহাকাশে প্রবেশের সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কিছু প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে।
মহাকাশ কি ভবিষ্যতে ধনী মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, নাকি সাধারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ আরও বাড়াবে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে মহাকাশের সম্পদ কারা ব্যবহার করবে, চাঁদ বা গ্রহাণুর খনিজ আহরণের নিয়ম কী হবে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয় আগামী কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় আলোচনায় পরিণত হতে পারে।
তারপরও গত ৬৯ বছরের ইতিহাস দেখায়, মানুষের মহাকাশযাত্রা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন যখন একা পৃথিবীর চারপাশ ঘুরেছিলেন, তখন মহাকাশযাত্রা ছিল প্রায় অকল্পনীয় ঝুঁকির একটি পরীক্ষা।
আজ অন্তত ৫২ দেশের ৭৪৬ জন মানুষ মহাকাশে গেছেন।
৮০টির বেশি দেশ কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠিয়েছে। নারী মহাকাশযাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। বেসরকারি যাত্রীরা মহাকাশে যাচ্ছেন। ভারত নিজস্ব মানববাহী অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মানুষ আবার চাঁদে ফেরার পথে এগোচ্ছে।
তবু সংখ্যাগুলো দেখায়, মহাকাশ এখনও সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হয়নি।
৭৪৬ জনের মধ্যে ৩৬৯ জনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার সম্মিলিত সংখ্যা ১৩৮। অর্থাৎ মহাকাশযাত্রার বড় অংশ এখনও অল্প কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত।একইভাবে নারী অংশগ্রহণ মাত্র ১৫ শতাংশ।
ভবিষ্যতের মহাকাশযাত্রা কতটা আন্তর্জাতিক, বৈচিত্র্যময় এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্পুটনিক-১ থেকে শুরু হওয়া ৬৯ বছরের যাত্রা প্রমাণ করেছে, মহাকাশ প্রযুক্তি খুব দ্রুত বদলাতে পারে। একসময় পৃথিবীর কক্ষপথে একটি ছোট উপগ্রহ পাঠানোই ছিল যুগান্তকারী ঘটনা। কয়েক বছরের মধ্যে মানুষ কক্ষপথে যায়, এরপর চাঁদে পা রাখে।
এখন মানবজাতির সামনে নতুন প্রশ্ন—পরবর্তী ৬৯ বছরে মানুষ কোথায় পৌঁছাবে?
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি, মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযান কিংবা আরও দূরের কোনো জগতে মানুষের উপস্থিতি—আজ যা ভবিষ্যতের কল্পনা, মহাকাশ ইতিহাস বলছে তার কোনোটি হয়তো একদিন বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।

